শংকরের সাক্ষাৎকার: কলকাতার স্মৃতি ও সাহিত্যের গল্প
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। বসন্তের আগমনী বার্তা তখন প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। গাছে গাছে নতুন পাতা, কুঁড়ির সৌরভ। প্রায় তিন বছর পর কলকাতায় ফিরে এলাম। বিধাননগরে একটি সামাজিক মিলনোৎসব এবং বারাসাতে একজন প্রকাশকের বার্ষিক সম্মিলনে অংশগ্রহণ করি। দুটি আয়োজনই ছিল একই দিনে, তবে প্রতিটির স্বকীয়তা ছিল আলাদা। একটি ছিল আনুষ্ঠানিক, অন্যটি লেখক-প্রকাশক-সম্পাদকের আড্ডা। এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে অভিভূত হয়েছি। অনেক চেনা-অচেনা মানুষের ভালোবাসা ও আলিঙ্গন আমাকে বিস্মিত করেছে।
শংকরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা
গল্পটা এখানেই শেষ হলে ভালো হতো, কিন্তু শেষ হয়নি। এর পেছনে রয়েছেন কথাসাহিত্যিক শংকর। তাঁর পুরো নাম মণিশংকর, তবে পাঠকদের কাছে তিনি শংকর নামেই পরিচিত। চৌরঙ্গী, আশা আকাঙ্ক্ষা, বিত্তবাসনার মতো জনপ্রিয় উপন্যাসের স্রষ্টা এই পশ্চিমবঙ্গের লেখক।
শংকর নিজের পুরো নাম ব্যবহারে দ্বিধা প্রকাশ করতেন। তিনি বলেছিলেন, "নিজের পুরো নামটা ব্যবহারে দ্বিধা ছিল; কারণ, আইনজ্ঞের চেয়ারে বসে যাদের দেখবার সুযোগ পেয়েছি, তাদের পরিচয় জানাজানি হোক, তা অভিপ্রেত ছিল না। পুরো নামটা চিরকালই পোশাকি নাম, বাড়িতে সবাই শংকর বলেই ডাকত। বারওয়েল সাহেব এই নামটা কর্মক্ষেত্রে চালু করে দিয়েছিলেন।"
এর আগে ২০১৪ সালে কলকাতায় গিয়ে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। এবার শংকরের সাক্ষাৎকার নেওয়ার কথা ভাবি। তিনি খুব বেশি মানুষের সামনে আসেন না। তাঁর ভাষায়, "কেউ আমাকে টেনে না আনলে কিংবা ধাক্কা না দিলে আমি আসলে নড়ি না।"
সাক্ষাৎকারের দিনটি
দিনটি ছিল ১ ফাল্গুন। বাংলাদেশে তখন ফাল্গুন বরণের নানা আয়োজন চলছে, কিন্তু কলকাতায় তার ছিটেফোঁটা কিছুই পেলাম না। শংকরদাকে ফোন করলাম। ভেবেছিলাম, তিনি অপরিচিত নম্বর রিসিভ করবেন না বা এড়িয়ে যাবেন। কিন্তু আমার ভাবনাটা ঠিক ছিল না। তাঁর কোনো অহংকার পেলাম না। আমার পরিচয় শোনার পর তিনি কিছুটা আবেগতাড়িত হলেন এবং তাড়াতাড়ি যেতে বললেন।
সফরসঙ্গীদের সঙ্গে সিনেমা দেখার কথা ছিল, কিন্তু সেটা বাদ দিয়ে শংকরের দেওয়া ঠিকানায় এগোতে থাকলাম। ঠিকানাটা সহজ হলেও কলকাতার সবকিছুকে আত্মস্থ করতে না পারায় কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। এর মধ্যে তিনি বেশ কয়েকবার ফোন করে ঠিকানা বোঝালেন। কিছুটা বিলম্বে একটি বড় অফিসে গিয়ে হাজির হই। সিকিউরিটি-রিসেপশনে আমার আসার কথা তিনি বলে রেখেছিলেন। তাঁরা আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেলেন।
শংকরের সঙ্গে আলাপচারিতা
অনেকগুলো রুমের মধ্যে শংকরের রুম খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়নি। তিনি আমাকে দেখে বেশ উচ্ছ্বসিত হলেন। মুখের কোণে একচিলতে হাসি টেনে নিলেন। বিনয়ী ও হাস্যোজ্জ্বল এই মানুষটির সঙ্গে অনেক কথা চলল। একের পর এক প্রশ্ন করলাম, তিনি বিরক্ত হলেন না। খুব সহজভাবে, বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিলেন। কোনো রাখঢাক ছিল না তাতে।
শংকরের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৭ ডিসেম্বর, তদানীন্তন যশোর জেলার বনগাঁওয়ে। আইনজীবী বাবা হরিপদ মুখোপাধ্যায়ের অকালমৃত্যুর পর ১৪ বছর বয়স থেকে উপার্জনের সংগ্রামে নেমে পড়েন তিনি। শংকর বলেন, "বাবার অকালমৃত্যুর পর সেই ১৪ বছর বয়স থেকে উপার্জনের সংগ্রামে নেমে পড়েছি, তারপর সারা জীবন দুনৌকায় পা দিয়ে জীবনসমুদ্রে ভেসে চলেছি।"
অল্প বয়সে বাবার পেশার সূত্রে কলকাতার হাইকোর্টে করণিক হিসেবে চাকরি পান। জীবনের শুরুতে ফেরিওয়ালা, টাইপরাইটার ক্লিনার, টিউশনি, শিক্ষকতা করেছেন। বারওয়েল সাহেবই তাঁকে সাহিত্য রচনায় অনুপ্রাণিত করেন। শংকরের প্রথম বই কত অজানারে প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে।
সাহিত্যকর্ম ও সমালোচনা
শংকরের প্রকাশিত গ্রন্থ শতাধিক। কত অজানারে, চৌরঙ্গী ছাড়াও রয়েছে নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি, মানচিত্র, বিত্তবাসনা, আশা আকাঙ্ক্ষার মতো উপন্যাস। তাঁর কয়েকটি বই চলচ্চিত্রেও রূপ পেয়েছে। সত্যজিৎ রায় তাঁর সীমাবদ্ধ ও জন অরণ্য উপন্যাসের কাহিনি অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।
চৌরঙ্গী উপন্যাস প্রকাশের পর সমালোচনার মুখেও পড়তে হয় তাঁকে। শংকর বলেন, "প্রথম দিন থেকেই সমালোচনা, যে রেস্টুরেন্ট আর রেস্তোরাঁর তফাত বোঝে না, সে লিখেছে হোটেল নিয়ে বই! পাঠকেরা যেমন ঢেলে দিয়েছেন, সমালোচকেরাও তেমনই ঢেলে আক্রমণ করে গেছেন। মানুষ বলে কেউ মনে করেনি। কোনো পুরস্কার দেয়নি। ভুল বললাম, একটা পুরস্কার চৌরঙ্গী পেয়েছিল। শ্রেষ্ঠ বাইন্ডিংয়ের জন্য।"
শংকরের জীবনদর্শন
শংকরের গল্পের নায়করা কোনো বীরপুরুষ নন, তারা আমাদের মতোই দ্বিধাগ্রস্ত, স্বপ্নবান, কখনো ভীত, কখনো আশাবাদী। তিনি প্রমাণ করেছেন, সাহিত্যের নায়ক মানেই অসাধারণ কেউ নয়, অতি সাধারণ মানুষও উপন্যাসের কেন্দ্র হতে পারে।
লেখকজীবনের আক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে শংকর বললেন, "মানুষমাত্রেই আক্ষেপ থাকে। সংবাদপত্রের নামীদামি লোকেরা নাক বেঁকিয়েছেন, উকিলের মুহুরি সে আবার কী লিখবে? বহুপঠিত হতে পেরেছি, এই অপরাধে বেশ কিছু শাস্তিও জুটেছে। যা সবাই বুঝতে পারে এবং বুঝে আনন্দ পায়, তা নাকি সাহিত্য পদবাচ্য নয়।"
শংকরের প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য এক মহিরুহ হারাল। কিন্তু তিনি যে জীবনদর্শন রেখে গেলেন—মানুষকে কাছ থেকে দেখা, ক্ষমতার আড়াল সরিয়ে ফেলা, সাধারণ মানুষের সংগ্রামকে মর্যাদা দেওয়া, তা দীর্ঘদিন আমাদের সঙ্গী হয়ে থাকবে।
