অমর একুশে বইমেলা শুরু: অনিশ্চয়তা কাটিয়ে উদ্বোধন
মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ প্রান্তে এসে শুরু হয়েছে অমর একুশে বইমেলা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই মেলার উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর বিকেলে সর্বসাধারণের জন্য মেলার দ্বার উন্মোচন করা হয়। এবার বইমেলার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'বহুমাত্রিক বাংলাদেশ'।
মেলার সময়সূচি ও পরিবর্তনের ইতিহাস
বাংলা একাডেমির আয়োজনে অমর একুশের বইমেলা সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে মাসব্যাপী চলে। তবে ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারণে মেলার সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বেশ কয়েক দফা তারিখ পরিবর্তনের পর ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে মেলা করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু এর মধ্যে পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ায় প্রকাশকদের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য দেখা দেয়। প্রধান প্রকাশকেরা মেলা বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। অবশেষে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির সঙ্গে আলোচনায় স্টল বরাদ্দের অর্থ সম্পূর্ণ মওকুফ করা হলে প্রকাশকেরা মেলায় অংশ নিতে সম্মত হন। এই দীর্ঘ দোলাচল শেষে গতকাল থেকে শুরু হলো ১৮ দিনের অমর একুশের বইমেলা, যা চলবে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত।
মেলার সময়সূচি ও বিশেষ ব্যবস্থা
পবিত্র রমজান মাসের কারণে এবার মেলার সময় এগিয়ে আনা হয়েছে। মেলার দৈনিক সময়সূচি নিম্নরূপ:
- প্রতিদিন বেলা দুইটায় মেলার দ্বার খুলবে এবং বিরতিহীনভাবে চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত।
- শুক্র, শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে শিশুপ্রহর থাকবে। মেলা খুলবে বেলা ১১টায় এবং শিশুপ্রহর চলবে বেলা ১টা পর্যন্ত।
- এর পর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে সবার জন্য। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত গ্রন্থানুরাগীরা মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন।
আজ শুক্রবার মেলার প্রথম শিশুপ্রহর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ ও মাঠের অবস্থা
বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, এবার মেলায় অংশ নিয়েছে ৫৪৯টি প্রতিষ্ঠান, যেখানে গতবার অংশ নিয়েছিল ৭০৮টি প্রতিষ্ঠান। মেলার বিস্তারিত বিন্যাস:
- বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানের ৮১টি স্টল রয়েছে।
- সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশকদের স্টল রয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চত্বরে, যেখানে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪৬৮।
মেলার প্রথম দিনে বিকেলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করে দেখা গেছে, হাতে গোনা দু-চারটি স্টলে বই সাজানো হয়েছে। অধিকাংশ স্টলেই নির্মাণ ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। মেলার সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় প্রকাশকেরা আগে থেকে স্টল নির্মাণে উদ্যোগী হতে পারেননি। মেলামাঠের অনেক প্রান্তে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর প্রান্তের বাতিঘর প্রকাশনীর স্টলের নির্মাণকাজ সন্ধ্যায় অন্ধকারে চলছিল। স্টলের ব্যবস্থাপক সঞ্জয় সূত্রধর জানান, তাঁদের সারির স্টলগুলোতে বিদ্যুৎ–সংযোগ দেওয়া হয়নি এবং কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা ও পাঠক প্রতিক্রিয়া
স্বাধীনতাস্তম্ভের পশ্চিম পাশের জলাধারের সামনে কথাপ্রকাশের স্টলে বই সাজানো সম্পন্ন হয়েছে। স্টলের ব্যবস্থাপক জাফিরুল ইসলাম জানান, তাঁদের বেশ কিছু নতুন বই এসেছে এবং প্রথম দিন থেকেই পাঠকরা নতুন বই হাতে পেতে পারেন। বই কিনতে এসেছিলেন দুই ভাই—নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসসির শিক্ষার্থী ভাস্কর খাসনবিশ ও ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজের চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী দিবাকর খাসনবিশ। তাঁরা বলেন, 'প্রথম দিনে নিরিবিলি পরিবেশ। যদিও অল্প কিছু স্টল ছাড়া সব স্টলেই নির্মাণকাজ চলছে। মেলার গড়ে ওঠার সময়ের এই পরিবেশটি বেশ অন্য রকম লাগছে।'
প্রথমা প্রকাশনের স্টল এবার মেলার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত। গতকাল দেখা গেছে, স্টলে বই সাজানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। উপব্যবস্থাপক কাউসার আহম্মেদ জানান, প্রথম দিনেই নতুন বই এসেছে এবং আনিসুর রহমানের গল্পগ্রন্থ 'সিসিফাস শ্রম' বিক্রি হয়েছে। এবার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই মেলায় আনা হবে এবং পর্যায়ক্রমিকভাবে প্রায় প্রতিদিনই নতুন বইগুলো আসতে থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
