নাসিমা আনিস: বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও সাহিত্যের গভীরে
বাংলাদেশের খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক নাসিমা আনিস এ বছর কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। ১৯৬২ সালের ১৬ নভেম্বর চাঁদপুর জেলায় জন্মগ্রহণকারী এই লেখকের সাহিত্য জীবন শুরু হয়েছিল ছোটগল্প দিয়ে, কিন্তু প্রথম গ্রন্থ ছিল উপন্যাস। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে বৃহন্নলা বৃত্তান্ত, নীলক্ষেত টু আজিমপুর স্কুল, চন্দ্রভানুর পিনিস, সাহসী খোকার গল্প, কুয়াশা কুয়াশা ভোর, ডুবসাঁতার, কলোনি এবং এমন মানুষ হতে চেয়েছিল।
পুরস্কার প্রাপ্তি ও সাহিত্য দর্শন
সাহিত্যিক সেঁজুতি বড়ুয়ার সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে নাসিমা আনিস বলেন, "আমার লেখক জীবন ২৩ বছরের—খুব দীর্ঘ নয়, আবার কমও নয়। আমি কখনো পুরস্কারের জন্য বিন্দুমাত্র ব্যস্ত ছিলাম না, তাই পুরস্কার পেয়ে বিস্মিত হয়েছি।" তিনি ব্যক্তিগত আনন্দকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, কারণ তার মতে লেখকের প্রকৃত স্বীকৃতি আসে পাঠকের কাছ থেকে।
পুরস্কার সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট: "লেখক লেখেন তার সামর্থ্য বা যোগ্যতা অনুসারে। সেখানে পুরস্কার কোনো ভূমিকা রাখে বলে মনে হয় না।" তিনি বিশ্বাস করেন না যে পুরস্কার লেখককে দায়বদ্ধ করে বা আরো স্বাধীন করে তোলে।
সমাজ ও সময়ের প্রতিফলন
নাসিমা আনিসের লেখায় সময় ও সমাজের স্পষ্ট উপস্থিতি লক্ষণীয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, "ভালো প্রশ্ন। আমি যখন কিছু পড়ি, প্রথমেই চাই সময়টাকে ধরতে। তখন সেই সময়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে আমার যে পূর্বধারণা থাকে, তা আমাকে এগিয়ে রাখে লেখাকে সহজে আত্মস্থ করতে।" লেখার সময় তিনি কিছুটা সচেতন থাকেন, তবে এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আসে।
নারী চরিত্র সৃষ্টি সম্পর্কে তিনি বলেন, "প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুই অভিজ্ঞতাই কাজ করে, কল্পনার খুব দরকার হয় না। এ সমাজে নারীকে অনেক কিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই যাত্রার বেশির ভাগই অনভিপ্রেত, অসুখকর।"
সাহিত্যের সামাজিক ভূমিকা
বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা প্রসঙ্গে নাসিমা আনিসের মন্তব্য, "সারা বিশ্বই ভয়াবহ রকমের অস্থির। আমাদের দেশে তা আরও বেশি। কোনো সচেতন মানুষই এর দায় এড়াতে পারে না। আমি সামান্য লিখতে পারি, লেখার মাধ্যমেই চেষ্টা করি কিছু বলতে।"
সাহিত্য সমাজ বদলাতে পারে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "সাহিত্য সরাসরি সমাজ বদলে অংশ নেয় না। মনোযোগী পাঠকের মননে দীর্ঘমেয়াদি ছাপ ফেলে। তখন কিছু কাজ হয়। শক্তিশালী সাহিত্য ইতিহাস পাল্টে ফেলার ক্ষমতা পর্যন্ত রাখে!"
তিনি একটি উদাহরণ দেন: "আমার উপন্যাস ‘মোহিনীর থান’ পড়ে আমার এক কলিগ তার বাচ্চাকে হিজড়াদের কোলে তুলে দেওয়ার আগে তাদের ঘরে বসতে দিয়েছিলেন, আপ্যায়ন করেছিলেন, অথচ তিনি আগে হিজড়াদের দেখলে ভয় পেতেন।"
তৃতীয় লিঙ্গ ও 'মোহিনীর থান'
তৃতীয় লিঙ্গ নিয়ে লেখা তার প্রথম উপন্যাস মোহিনীর থান ২০০৬ সালে দৈনিক আজকের কাগজ (বর্তমানে জেমকন) প্রবর্তিত তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার পায়। এই উপন্যাস নিয়ে তিনি বলেন, "‘মোহিনীর থান’ নিয়ে খুব বেশি হলে একটি গল্পই লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভেতরে ঢুকে আমি বেদনায় কুঁকড়ে যাই। মনে হয়েছে, ভদ্রবেশী আমরা ওদের কতটা আলাদা করে রেখেছি। তারা আমাদের বিশ্বাস পর্যন্ত করে না।"
লেখার সময় তিনি অভিজ্ঞতাকে ভাষার সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। "অবশ্যই অভিজ্ঞতার। অভিজ্ঞতা পরম সম্পদ। আখ্যানের ভাষা আসে বিষয়কে অবলম্বন করে, ভাষার সৌন্দর্য আমার প্রিয় বিষয়।"
অন্যান্য পুরস্কার ও শিক্ষাজীবন
নাসিমা আনিসের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- চন্দ্রভানুর পিনিস উপন্যাসের জন্য দৈনিক সমকাল প্রবর্তিত নবীন কথাসাহিত্য পুরস্কার ২০০৯
- চাঁদপুর সাহিত্য মঞ্চ আয়োজিত মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার ২০২০
- রণজিৎ বিশ্বাস-অভিষেক স্মৃতি সম্মাননা ২০২১
- বাংলা একাডেমির প্রবর্তিত আবু রুশদ সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪
তিনি আজিমপুর গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি, ইডেন কলেজ থেকে এইচএসসি এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন চট্টগ্রাম কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিরিশ বছর শিক্ষকতা করেছেন এই সাহিত্যিক।
সমসাময়িক সাহিত্য ও চ্যালেঞ্জ
তরুণ পাঠকদের বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়া প্রসঙ্গে নাসিমা আনিস বলেন, "দেখুন, কিছু সিরিয়াস পাঠক চিরকাল থাকেন। তবে তারা তরুণ কী বয়স্ক তা বয়স দিয়ে মাপা যায় না। সার্বিকভাবে পাঠচর্চা তরুণদের মধ্যে সংগত কারণেই কমে গেছে, যেমন বয়স্করাও অন্য মিডিয়া বেছে নিয়েছেন।"
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব সম্পর্কে তার মত, "লেখকের যে রহস্য থাকে, অদেখার রহস্য, কত কৌতূহল—সেটা প্রায় চুকে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া ভালো না খারাপ তা যেমন বলতে পারব না, তেমনি তাতে লেখক ভঙ্গুর হচ্ছে কিনা তাও বলতে পারছি না।"
বাংলাদেশের নারী লেখকদের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, "নারী পুরুষ দুজনের একটাই বড় চ্যালেঞ্জ, তাদের জীবিকার জন্য লড়তে হয়। নারীকে বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে ঘরটাও সামলাতে হয়। এদিক দিয়ে আমাদের দেশের পুরুষরা খুব ভাগ্যবান!"
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্তির পর পাঠকের কাছে তার নতুন প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে নাসিমা আনিস বলেন, "হয়ত আরেকটু সচল হতে চেষ্টা করব, প্রায় এক বছর মন খুব বিক্ষিপ্ত ছিল। এখন মনকে ধরেবেঁধে একত্র করব। বয়স বাড়ছে। সামনের কয়েকটা বছর লিখে যেতে চাই নিজেকে সামলে রেখে।"
লেখালেখির শুরু ও বর্তমানের মধ্যে পার্থক্য সম্পর্কে তার মন্তব্য, "আমার বয়স বেড়ে চল্লিশ থেকে তেষট্টি হয়েছে। আর বইপত্র ও লেখকদের সঙ্গ, আর মমতা ও নির্মমতায় মেশানো এই পৃথিবীতে বসবাসের কারণে একটু অভিজ্ঞতাও বেড়েছে।"
