সাজিদ উল হক আবিরের নতুন উপন্যাস 'সরীসৃপতন্ত্র' নিয়ে বইমেলার প্রস্তুতি ও চিন্তাভাবনা
সাজিদ উল হক আবিরের 'সরীসৃপতন্ত্র' ও বইমেলা নিয়ে বিশেষ সাক্ষাৎকার

সাজিদ উল হক আবিরের নতুন উপন্যাস 'সরীসৃপতন্ত্র' নিয়ে বইমেলার প্রস্তুতি

বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে বইমেলা আসন্ন। এবারের বইমেলায় লেখক সাজিদ উল হক আবির তার নতুন উপন্যাস 'সরীসৃপতন্ত্র' নিয়ে হাজির হচ্ছেন পাঠকদের সামনে। দীর্ঘ এক বছর ধরে তিনি দুটি বইয়ের কাজ করছিলেন। একটি তার দ্বিতীয় উপন্যাস 'সরীসৃপতন্ত্র', অন্যটি মিলান কুণ্ডেরার বিখ্যাত উপন্যাস 'দা আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং' এর অনুবাদ। প্রথম উপন্যাসটির কাজ সম্পন্ন করে তিনি প্রকাশকের কাছে জমা দিতে পেরেছেন। তবে অনুবাদ উপন্যাসটির ভাষা সম্পাদনার কাজ এখনও শেষ হয়নি।

উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও সময়কাল

সাজিদ উল হক আবিরের নতুন উপন্যাস 'সরীসৃপতন্ত্র' এর মূল বিষয় হলো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রেম এবং মানবীয় সম্পর্কের জটিলতা। উপন্যাসের সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১৯৮৭ সাল। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত টালমাটাল একটি বছর, যখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে ছিল।

উপন্যাসের গল্প শুরু হয় নূর হোসেন শহিদ হওয়ার তিন দিন আগে থেকে এবং শেষ হয় সেই ঐতিহাসিক মিছিলে এসে, যেখানে নূর হোসেন শহিদ হন। তবে লেখক জোর দিয়ে বলেন, উপন্যাসের সব চরিত্রই কাল্পনিক। গল্পের পটভূমি তৈরি হয়েছে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারের হাসনাবাদ এলাকার 'টাইগারপাড়া' নামক একটি কাল্পনিক মহল্লাকে কেন্দ্র করে।

লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি: সাজিদ উল হক আবির বলেন, "যে উপন্যাসে আমি সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ে কিছু বলতে চাই, সেখানে আমি চরিত্রগুলোকে বর্তমান সময়ে স্থাপন করি না। কারণ 'বর্তমান' খুব ঘোলাটে একটি ব্যাপার। চলমান সময়ে ঠিক-বেঠিক নির্ণয় করা যায় না। ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে লেখকের একটি নৈর্ব্যক্তিক দূরত্ব তৈরি না হলে সে বিষয়ে মন্তব্য হয়ে যায় আবেগপ্রসূত এবং ব্যক্তিগত পক্ষপাতদুষ্ট।"

বইমেলা নিয়ে চিন্তাভাবনা ও উদ্বেগ

এবারের বইমেলা নিয়ে লেখক বেশ কিছু বিষয়ে তার মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, বইমেলার সময়সীমা কমিয়ে আনা বইয়ের বিক্রিতে বড় প্রভাব ফেলবে না, কারণ বইয়ের বিক্রি সাধারণত মেলার শেষ দিকেই বেশি হয়। তবে লেখক-পাঠকদের আড্ডা দেওয়ার সময় কিছুটা কমে যাবে।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ: জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দশ দিনের মধ্যেই বইমেলা শুরু হবে বলে নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা শঙ্কা থেকেই যায়। ক্ষমতা ও প্রশাসনিক পালাবদল তখনও ঠিকভাবে সম্পন্ন নাও হতে পারে।

রমজানের প্রভাব: রমজান মাসের প্রেক্ষাপটে বইমেলায় মানুষের সমাগম কিছুটা কম হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

প্রকাশকদের মধ্যে বিভাজন

লেখক লক্ষ্য করেছেন যে এবারের বইমেলা নিয়ে প্রকাশকদের মধ্যে একটি বড় বিভাজন তৈরি হয়েছে। একদল প্রকাশক চেয়েছিলেন বইমেলা ডিসেম্বর মাসেই হয়ে যাক, অন্যদল চেয়েছিলেন একুশে ফেব্রুয়ারির সংশ্লিষ্টতার জন্য মেলা ফেব্রুয়ারিতেই হোক। যেহেতু প্রকাশকদের বইয়ের বিক্রি সরাসরি বইমেলার সঙ্গে জড়িত, তাই তাদের ঐকমত্যে পৌঁছানো সবার জন্যই ভালো হতো।

ডিজিটাল যুগে বইমেলার চ্যালেঞ্জ

সাজিদ উল হক আবির ডিজিটাল যুগে বইমেলার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর চিন্তা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "আমাদের শৈশবে বই ছিল স্বপ্নের প্রতিশব্দ। প্রতি বছর বইমেলা মানে নতুন নতুন বই দেখা, বাছাই করে কেনা এবং সেগুলো পড়ে বছরের অর্ধেক পার করে ফেলা। কিন্তু এখন বইমেলায় গেলে মন খারাপ হয়ে যায়। বইয়ের স্টলের সামনে বই কেনার চেয়ে সেলফি তোলার জন্য ভিড় বেশি হয়।"

তিনি আরও যোগ করেন, "সামগ্রিকভাবে জাতির মননে পরিবর্তন না আনলে, জাতি বইমুখী না হলে বইমেলার অবকাঠামোগত এবং পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে মেলাকে সফল করা যাবে না। স্মার্টফোনে রিলস-শর্টস দেখা বন্ধ করানো না গেলে বইমেলার আয়োজন নিয়ে যত পরিকল্পনাই করা হোক, সবই ব্যর্থ হবে।"

ডিজিটাল ডেটাবেইজ ও বইয়ের ভবিষ্যৎ

প্রকাশিত বইয়ের ডিজিটাল ডেটাবেইজ সংরক্ষণ নিয়ে সাজিদ উল হক আবিরের একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। তিনি মনে করেন, প্রকাশিত বইয়ের তালিকা সংরক্ষণ করা যেতে পারে, কিন্তু প্রতিটি বইই ডিজিটাল ভার্সনে রূপান্তরিত করার পক্ষপাতী তিনি নন।

তিনি বলেন, "যে বইয়ের যোগ্যতা আছে, তা ছাপার হরফে, মলাটবদ্ধ অবস্থাতেই টিকে যাবে। আর যে বই টেকার না, সেটাকে ই-বুক বানিয়ে ই-বুকের রাজ্যে আরও জঞ্জাল বাড়ানোর পক্ষপাতী আমি নই। অধিক ম্যাটেরিয়াল থাকার ঝামেলা হলো, তাতে দরকারি ম্যাটেরিয়াল দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।"

পাঠক-লেখক সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা

বর্তমান সময়ে পাঠক-লেখক সম্পর্কের পরিবর্তন নিয়েও লেখক তার অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, "লেখক বলতে বর্তমানে একটি বিচিত্র এবং বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠীকে বোঝায়। প্রাবন্ধিক, কবি, কথাসাহিত্যিক—এরাও লেখক, আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় সেলিব্রেটি বা ইনফ্লুয়েন্সারদের বইও প্রচুর পরিমাণে বের হচ্ছে এবং বিক্রি হচ্ছে।"

তিনি আরও বলেন, "যারা শুধু লেখার কাজটাই যত্ন করে করেন, নিজের পাবলিক পারসোনা ঠিকভাবে হাইলাইট করতে পারছেন না, তারা সেভাবে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগটা তৈরি করতে পারছেন না। নতুন লেখকদের জন্য এটি একটি নির্মম সময়।"

বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে দায়িত্ব

বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে সাজিদ উল হক আবির মনে করেন যে এই দায়িত্ব পুরোপুরি প্রকাশকের নয়। তিনি বলেন, "একজন ভালো প্রুফরিডারকে দেখিয়ে নিজের বইয়ের বানান নির্ভুল করা, সম্ভব হলে আরও কিছু পয়সা খরচ করে একজন ভাষা সম্পাদককে দেখিয়ে নেয়া—এগুলো লেখকের দায়িত্বের ভেতরেই পড়ে। বইয়ের প্রচ্ছদ তো ভালোই হয়। কিন্তু ভেতরের কনটেন্ট কেমন হবে, সেটা নির্ণয় করা প্রকাশকের দায়িত্ব নয়। সেটা নিশ্চিত করা লেখকের কাজ।"

তিনি শেষ করেন এই বলে, "আপনি জানেন, আপনার লেখাটা বই আকারে ছাপার মতো না, তবুও পয়সা দিয়ে একটা বই ছাপাচ্ছেন, এতে তো লেখক হিসেবে আপনার আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগার কথা।"