বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায়: প্রয়াত হলেন শংকর
বাংলা সাহিত্য জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটেছে। চিরতরে বিদায় নিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়, যিনি পাঠক মহলে 'শংকর' নামেই সমধিক পরিচিত। শুক্রবার দুপুরে ৯২ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, যা সমগ্র সাহিত্য অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছে।
শেষ দিনগুলো এবং অসুস্থতার বিবরণ
পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, গত বছরের শেষের দিকে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এই প্রবীণ সাহিত্যিক। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু এবার আর ফেরা হলো না; পাঠকদের শোক সাগরে ভাসিয়ে তিনি পাড়ি দিলেন 'কত অজানারে'র পথে, যা তার প্রথম উপন্যাসের নামও বটে।
জীবনসংগ্রাম এবং সাহিত্য যাত্রার সূচনা
হাওড়ার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা শংকরের জীবনসংগ্রাম শুরু হয়েছিল কলকাতার রাজপথে কাজের খোঁজের মধ্য দিয়ে। একসময় তিনি ব্যারিস্টার নোয়েল বারওয়েলের ক্লার্ক হিসেবে কাজ শুরু করেন, যিনি তার জীবনের প্রথম 'আইকন' হিসেবে বিবেচিত হন। বারওয়েল সাহেবের মৃত্যুর পরই শংকর কলম ধরেন এবং লেখেন তার প্রথম উপন্যাস 'কত অজানারে'। ১৯৫৫ সালে প্রকাশের পরপরই বইটি পাঠকদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়, যা তাকে বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কালজয়ী সৃষ্টি এবং সাহিত্যিক উত্তরাধিকার
পরবর্তীতে 'চৌরঙ্গী', 'সীমাবদ্ধ', 'জনঅরণ্য' এবং 'অচেনা অজানা বিবেকানন্দ'-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে তার জনপ্রিয়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। আশি বা নব্বইয়ের দশক ছাড়িয়ে আজকের ডিজিটাল যুগেও শংকরের লেখনী একইভাবে প্রাসঙ্গিক, যা তার সাহিত্যের টেকসই মূল্যকে প্রমাণ করে।
রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক মহলের শোকপ্রকাশ
শংকরের প্রয়াণে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, "মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তার প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঙালি পাঠককে তার সৃষ্টি মুগ্ধ করেছে।" এই মন্তব্য তার সাহিত্যিক অবদানের গভীরতা তুলে ধরে।
পুরস্কার ও সম্মাননা
দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে পাঠকদের ভালোবাসার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় সম্মানেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। ২০০৩ সালে তিনি লাভ করেন 'সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার', যা ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মানগুলোর একটি। এ ছাড়া 'বঙ্গবিভূষণ'সহ অসংখ্য ছোট-বড় সম্মাননা পেয়েছেন তিনি, যা তার সাহিত্যিক মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করে।
সাহিত্যের বাইরে দায়িত্ব পালন
সাহিত্যের বাইরে একসময় পশ্চিমবঙ্গের শেরিফ পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছেন এই গুণী ব্যক্তিত্ব, যা তার বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দেয়। তার প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য একটি অমূল্য সম্পদ হারালো, কিন্তু তার লেখনী চিরকাল বাঙালি পাঠকদের হৃদয়ে জাগরুক থাকবে।
