ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ছবির ফটোগ্রাফার মীজানুর রহমানের আবিষ্কার
ভাষা আন্দোলনের ছবির ফটোগ্রাফার মীজানুর রহমান

ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ছবির পেছনের গুণী ফটোগ্রাফার

বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদের একটি ছবি বাঙালির হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এই ছবিটি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তোলা হয়েছিল, যেখানে গুলিবিদ্ধ রফিকের মরদেহ স্ট্রেচারে শায়িত। ছবিটি একটি সাধারণ বক্স ক্যামেরায় তোলা সাদাকালো চিত্র হলেও এর অন্তর্নিহিত বাণী এতই তীক্ষ্ণ ছিল যে, তা তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছিল।

ছবি প্রকাশে বাধা ও পরবর্তী প্রচার

প্রেস সেন্সরশিপের কারণে ১৯৫২ সালে এই ছবিটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। পরের বছর, ১৯৫৩ সালে, সাপ্তাহিক ইত্তেফাক একুশের বিশেষ সংখ্যায় এটি প্রথম প্রকাশ করে। এরপর ভাষাশহীদদের স্মরণে পূর্ব বাংলা ছাত্রলীগের লিফলেট, বাংলা একাডেমির প্রকাশনা এবং অন্যান্য গ্রন্থে এই ছবিটি ক্রপ বা হুবহু প্রকাশিত হয়। তবে, দীর্ঘকাল ধরে এই ছবির ফটোগ্রাফারের নাম অজানা থেকে যায়।

মীজানুর রহমান: আবিষ্কৃত ফটোগ্রাফার

তিন বছরের গভীর গবেষণার পর ইতিহাসের পাতায় লুকিয়ে থাকা এই আলোকচিত্রীর পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি হলেন মীজানুর রহমান (১৯৩১-২০০৩), যিনি ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্নে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শহীদ রফিকের এই ঐতিহাসিক ছবিটি তুলেছিলেন। মীজানুর তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ও ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন, এবং সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে সহসম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন।

ছবি তোলার মুহূর্ত ও পরিণতি

২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিবর্ষণের সময় মীজানুর রফিকের পাশেই ছিলেন। রফিকের মাথায় গুলি লাগার পর ছাত্ররা তাঁকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান, সেখানেই মীজানুর বক্স ক্যামেরা দিয়ে এই ছবি তুলেন। ছবিটি প্রিন্ট করে ইত্তেফাক অফিসে জমা দেওয়া হলেও শাসকগোষ্ঠীর চাপে তা তখন প্রকাশিত হয়নি। পরবর্তীতে মীজানুর দৈনিক ইত্তেফাকের ক্রীড়া সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনালের সম্পাদক এবং বাসসের বাণিজ্যিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

নেগেটিভ হারানোর দুঃখজনক ঘটনা

মীজানুরের ছেলে শাহরিয়ার জিয়াউর রহমানের সাক্ষাৎকারে জানা যায়, ২০১০ সালে একটি প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা তাদের বনগ্রাম লেনের বাড়ি জোরপূর্বক দখল করলে, মীজানুরের তোলা অনেক ঐতিহাসিক ছবির নেগেটিভ ও পেপার কাটিং নষ্ট হয়ে যায়। এই ঘটনা ভাষা আন্দোলনের মূল দলিলের একটি বড় ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত।

উপসংহার

মীজানুর রহমানের এই আবিষ্কার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করেছে। তাঁর সাহসী ফটোগ্রাফি শুধু একটি ছবি নয়, বরং বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি প্রামাণিক দলিল হয়ে আছে। সাত দশক পরে তাঁর নাম ও অবদানের স্বীকৃতি পাওয়া ইতিহাস গবেষণার একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।