মায়েরা বোধ হয় পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব অথচ সর্বজ্ঞ মানুষ। সন্তানের মুখে কথা ফোটার আগেই তাঁরা তার অভাব বুঝে ফেলেন, মনের গোপন কষ্ট পড়ে ফেলেন, অপ্রকাশিত প্রয়োজনও টের পান। আমার মা তেমনই—একজন সবজান্তা মা।
মায়ের অমোঘ টান
মাসের শেষ, পকেট প্রায় শূন্য—কিছু বলার আগেই মা হাতে গুঁজে দেন কিছু টাকা। কখনো চাইতে হয়নি। বরং বলতে গেলে, ‘মা, এসবের কী দরকার?’—মা হেসে বলেন, ‘এখন নাও, পরে দিয়ে দিয়ো।’ সেই ‘পরে’ আর কখনো আসে না। মাকে বড় ভাই হাতখরচের টাকা দেন। আমিও মাসে কিছু দিই। কিন্তু মা যেন সন্তানের কাছ থেকে নেন না, উল্টো দিয়েই যান। কখনো আচার, কখনো নিজ হাতে গুঁড়া করা হলুদ-মরিচ, কখনো শীতের জন্য বরিশালের বানারীপাড়া থেকে বানিয়ে আনা নকশিকাঁথা। পিঠা তো আছেই—যেন মায়ের ভালোবাসার এক অনন্ত উৎসব।
সন্তানের পছন্দে মায়ের নজর
আমি সবজি, ছোট পাঁচমিশালি মাছ, ভর্তা পছন্দ করি—মা জানেন। আমার বাসায় এলে নিজের টাকায় বাজার করিয়ে এসব রান্না করেন। বয়স নব্বই ছুঁই ছুঁই, তবু সন্তানের জন্য তাঁর ব্যস্ততার শেষ নেই। অথচ নিজের জন্য তাঁকে কখনো কিছু কিনতে দেখিনি। নিজের শখ-আহ্লাদ বোধ হয় বহু আগেই সন্তানের কল্যাণে বিলীন করে দিয়েছেন।
মায়ের চোখ এড়ায় না কিছুই
মায়ের চোখ এড়ায় না কিছুই। মুখ শুকনো দেখলে জিজ্ঞেস করেন, ‘বাবা, কী হয়েছে?’ পুরোনো শার্ট, ছেঁড়া মোজা, হলদে হয়ে যাওয়া গেঞ্জি, তাড়াহুড়োয় ভাঁজ হয়ে যাওয়া জুতা—সবই তাঁর চোখে পড়ে। শার্ট কেনার টাকা দেন, মোজা কিনতে বলেন, বুয়ার হাতে নীলের প্যাকেট ধরিয়ে দেন। এমনকি নিজে না পারলে বড় ভাইকে বলে দেন আমার জন্য কিনে দিতে।
ভাত খাওয়ার দৃশ্য
ভাত খেতে বসলে মা পাতে তুলে দেন একের পর এক। আমি বলি, ‘মা, বেশি হয়ে যাচ্ছে।’ মা শুনবেন না। পাশে বসে থাকেন, আমি খাই—তিনি দেখেন। মনে হয়, সন্তানের তৃপ্তিময় খাওয়ার দৃশ্যই যেন তাঁর কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য।
নীরব মুহূর্তের গল্প
২০০৫ সালের কথা। ছোট্ট চাকরি করি। ইনক্রিমেন্ট হলো। কাউকে না জানিয়ে সব টাকা দিয়ে মাকে একটা শাড়ি কিনে দিয়েছিলাম। এ কথা আজও আমি ছাড়া আর কেউ জানে না। মনে হয়, সন্তানের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা নীরব থাকলেই পূর্ণ হয়।
করোনাকালের কঠিন সময়
করোনাকালে মা আক্রান্ত হলেন। মাঝরাতে হাসপাতালে ভর্তি করালাম। আমি আর বড় ভাই সারা রাত করিডরে বসে কাটালাম। মশা, অস্বস্তি, দুশ্চিন্তা—সব ছিল। কিন্তু মায়ের মায়ার কাছে সেসব কষ্ট কিছুই নয়। মানুষ বলেছিল, হাসপাতালে বারবার গেলে আমাদেরও করোনা হতে পারে। আমরা পাত্তা দিইনি। আমাদের কাছে তখন মা-ই সবার আগে।
অসুস্থ মায়ের জন্য ছোটাছুটি
আরেকবার গ্রাম থেকে খবর এল—মা গুরুতর অসুস্থ, বরিশাল মেডিকেলে নেওয়া হয়েছে। অফিস থেকে ছুটে গাবতলী, এরপর লোকাল বাসে দীর্ঘ যাত্রা। ভাবির ফোন—‘দ্রুত আসো, অবস্থা ভালো না।’ সারাটা পথ কান্না করতে করতে গেছি। আশপাশের লোকের বিস্মিত চোখ দেখেছি, কিন্তু কান্না থামেনি।
পরে জেনেছি, ফোনের সময় মায়ের পালস প্রায় পাওয়া যাচ্ছিল না। চিকিৎসক আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে পিত্তথলির অপারেশন হয়েছিল। পরে এক রাতে অক্সিজেন কমে গিয়ে আইসিইউতে নিতে হলো। আইসিইউর সামনে সেই নির্ঘুম রাত—ভয়, প্রার্থনা, মৃত্যুর গন্ধ আর জীবনের আকুতি—সব মিশে এক অদ্ভুত অনুভব। সেখানে বসে বুঝেছিলাম, মায়ের জন্য সন্তানের অপেক্ষা কেবল অপেক্ষা নয়, তা একধরনের ইবাদত।
সত্য গল্প, অলংকৃত নয়
আমি যা লিখলাম, এর একটিও কল্পনা নয়। সবই জীবনের সত্য। বাড়িয়ে বলা নয়, বরং না-বলা গল্প আরও অনেক।
মা: আশ্রয় ও ছায়া
মা আসলে শুধু একজন মানুষ নন—একটি আশ্রয়, একটি ছায়া, একটি অনন্ত দোয়া।
পৃথিবীর সব মা ভালো থাকুন। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সন্তানেরা যেন বুঝতে শেখে—ভালোবাসা কখনো উচ্চারণে নয়, তা থাকে নীরব যত্নে, অদৃশ্য হাতে।
লেখক: বানারীপাড়া, বরিশাল-৮৫৩০



