আধুনিক জীবনে তরুণ-তরুণীদের বিয়ে: আস্থার সংকট ও পরিবর্তনশীল সংস্কৃতি
আধুনিক জীবনে তরুণ-তরুণীদের বিয়ে: আস্থার সংকট

‘২৯ বছর বয়সে এসে মনে হচ্ছে, ঢাকার এই তুমুল ব্যস্ততায় একা একটা মানুষ খুঁজে পাওয়া লটারির টিকিট পাওয়ার মতো। ডেটিং অ্যাপে আলাপ হয় ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে সেখানে এক ধরনের মেকি আবহ থাকে। ওদিকে আত্মীয়স্বজনরাও এখন আর আগের মতো সম্বন্ধ নিয়ে আসেন না। এক অদ্ভুত শূন্যতায় দিন কাটছে।’ কথাগুলো বলছিলেন ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত আশরাফুল ইসলাম। বয়স উনত্রিশ, শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু জীবনসঙ্গী খোঁজার প্রশ্নে ঠিক যেন দিকহারা।

ডেটিং অ্যাপে মোহভঙ্গ, বাড়ছে হতাশা

এই আক্ষেপ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আধুনিক নাগরিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঢাকার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীদের একটি বড় অংশ আজ জীবনসঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রে এক গভীর আস্থার সংকটে পড়েছেন। একদিকে ডেটিং অ্যাপের প্রতি তীব্র অনীহা, অন্যদিকে পুরোনো পারিবারিক কাঠামোর অনুপস্থিতি। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের চিরচেনা বিয়ে ও সম্পর্কের সংস্কৃতি।

একটা সময় ধারণা করা হয়েছিল, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ডেটিং অ্যাপের রমরমা হবে। বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। সম্প্রতি ম্যাচমেকিং প্ল্যাটফর্ম সাইয়োনি-এর নিবন্ধিত ব্যবহারকারীদের মধ্যে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৮৮ শতাংশ তরুণ-তরুণীই বর্তমানের ডেটিং সংস্কৃতি নিয়ে হতাশ এবং নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। একসময় যারা ডেটিং অ্যাপে ঢুকেছিলেন, তাদের বেশিরভাগই এখন আর সক্রিয় নেই। মাত্র ১৫ শতাংশ এখনো সেখানে আছেন। ডিজিটাল দুনিয়ার এই মেকি সম্পর্কের ক্লান্তি মানুষকে আবার ফিরিয়ে আনছে শিকড়ের কাছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পারিবারিক সম্মতির বিয়ে: হাইব্রিড সমাধানের সন্ধান

ঢাকার শিক্ষিত সমাজে পারিবারিক সম্মতির বিয়ে এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে এই প্রজন্মের অ্যারেঞ্জড ম্যারেজের ধারণা আশি বা নব্বইয়ের দশকের মতো নয়। তারা খুঁজছেন একটি হাইব্রিড সমাধান। পরিবারের উদ্যোগকে স্বাগত জানান, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে নিজেরা একে অপরকে জানার সুযোগ চান। চোখ বন্ধ করে বিয়ে করার দিন যেমন শেষ, তেমনি পরিবারের অমতে গিয়ে ঝুঁকি নিতেও নারাজ এই প্রজন্ম।

বিয়ের উদ্যোগে এখন সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকেন মায়েরা। ছেলে হোক বা মেয়ে, সন্তানের জীবনসঙ্গী খোঁজার দায়িত্বটা পরিবারে সবার আগে কাঁধে তুলে নেন মা-ই। প্রবাসীদের প্রতি আগ্রহও কমেনি একটুও। বরং বিদেশে স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন পাত্র বা পাত্রীর খোঁজ এখনো বেশিরভাগ পরিবারের অগ্রাধিকারের তালিকায় শীর্ষে।

বিচ্ছেদের পর নতুন জীবন: সামাজিক ট্যাবু ভাঙছে

ভাঙছে আরও একটি সামাজিক ট্যাবু। বিচ্ছেদের পর নতুন করে জীবন শুরু করার ইচ্ছাকে সমাজ এখন আগের চেয়ে অনেক সহজভাবে দেখছে। একক অভিভাবকরাও এগিয়ে আসছেন নতুন সঙ্গীর খোঁজে। এটি একটি বড় সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

আশি বা নব্বইয়ের দশকে পাড়ায় পাড়ায় নিঃস্বার্থ মুরুব্বিরা চেনা পরিবারগুলোর মধ্যে সম্বন্ধ এনে দিতেন। সেই মানুষগুলো এখন আর নেই। পরিবার ভেঙে গেছে, মানুষ চলে এসেছে ফ্ল্যাট কালচারে। পাশের ফ্ল্যাটের মানুষকেই যেখানে চেনা যায় না, সেখানে নিঃস্বার্থ ঘটকালির মানুষ পাওয়া আজ দুর্লভ। এই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে প্রথাগত ম্যারেজ মিডিয়ার দ্বারস্থ হচ্ছেন অনেকে। ফলাফল হচ্ছে নতুন তিক্ততা। জরিপ বলছে, প্রথাগত ম্যারেজ মিডিয়ার ওপর আস্থা রাখছেন মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ। চড়া রেজিস্ট্রেশন ফি, ভুয়া প্রোফাইল, অপেশাদার আচরণ, এই অভিযোগগুলো এখন প্রায় সর্বজনবিদিত। পরিবার থেকে বিয়ের চাপ আসছে, কিন্তু পছন্দের প্রস্তাব কেউ এনে দিতে পারছে না। প্রতি তিনজনের একজন তরুণ এই দুয়ের মাঝে তীব্র মানসিক চাপ অনুভব করছেন।

প্রযুক্তিনির্ভর ম্যাচমেকিং: নতুন সম্ভাবনা

একদিকে ডেটিং অ্যাপের মোহভঙ্গ, আরেকদিকে ঘটকের প্রতারণা। এই দুইয়ের মাঝখানের শূন্যস্থান পূরণ করতে এখন তৈরি হচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর ও দায়িত্বশীল ম্যাচমেকিং প্ল্যাটফর্ম। যেখানে পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষা হবে, প্রোফাইল যাচাই করা হবে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি থাকবে পেশাদার তত্ত্বাবধানে। এই ধারণারই একটি বাস্তব প্রতিফলন হলো সাইয়োনি। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা তানভীর রহমান বলেন, ‘আমি নিজে ঘটকের কাছে প্রতারিত হয়েছি। কিন্তু আমার চেয়েও বেশি কষ্ট পেয়েছি যখন দেখেছি এটা শুধু আমার গল্প নয়, হাজারো শিক্ষিত পরিবারের একই অভিজ্ঞতা। সেই ক্ষোভ থেকেই সাইয়োনির জন্ম।’

আজকের আত্মকেন্দ্রিক নাগরিক জীবনে যেখানে আস্থার বড় অভাব, সেখানে এই ধরনের প্ল্যাটফর্মগুলো আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আশির দশকের সেই হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক আন্তরিকতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। বিয়ে কোনো সাময়িক চুক্তি নয়, এটি দুটি পরিবারের মেলবন্ধন। আর তাই জীবনসঙ্গী খোঁজার এই যাত্রায় আজকের তরুণ প্রজন্ম এমন এক মাধ্যমের খোঁজ করছেন যেখানে আধুনিক মননশীলতার সঙ্গে মিশে থাকবে চিরন্তন পারিবারিক মূল্যবোধ।