ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে বোর্ডিং পাস নিয়ে অপেক্ষারত অবস্থায় স্বচ্ছ কাচের ওপারে সারিবদ্ধ বিমানগুলো নীল তিমির মতো মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই নীল তিমির পেটে ঢুকে পড়ব আমরা। সুবহে সাদিকের পরপরই এটি আমাদের ঢাকায় ফিরিয়ে দেবে। ইমিগ্রেশন শেষ করে ব্যাগ-বোঁচকা নিয়ে বাসায় ফিরে যাব। এই যাত্রাটা সেখানেই মিলিয়ে যাবে, যেখান থেকে এর শুরু হয়েছিল।
PIARC সম্মেলনে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল
PIARC বা ওয়ার্ল্ড রোড অ্যাসোসিয়েশন একটি বৈশ্বিক ফোরাম, যা ১৯০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদর দপ্তর ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত। এই সংস্থা টেকসই সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য আন্তর্জাতিক কার্যক্রম, গবেষণা সমন্বয় ও কংগ্রেস আয়োজন করে থাকে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১২০টির বেশি দেশ এর সদস্য। ফ্রান্সের চেম্বারি শহরে ১০-১৩ মার্চ ২০২৬ তারিখে ‘১৭তম ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অন রোড উইন্টার সার্ভিস, রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড ডিকার্বোনাইজেশন’ শীর্ষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ওয়ার্ল্ড রোড অ্যাসোসিয়েশন সচিবালয় থেকে বাংলাদেশে প্রতিনিধি প্রেরণের অনুরোধ আসে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মইনুল হাসান PIARC মনোনীত প্রথম প্রতিনিধি হিসেবে চারজনের একটি দলকে সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনীত করেন। ভিসা জটিলতার কারণে সহকর্মী মামুন কায়সার অংশগ্রহণ করতে না পারলেও বাকি তিনজন—মাহবুব, মনির ও লেখক—প্যারিসের উদ্দেশে যাত্রা করেন। সহকর্মী মাহবুব এই দলের দলনেতা ছিলেন এবং তাঁর একটি গবেষণাপত্র PIARC কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল। মাহবুব সম্মেলনের একটি সেশনে তাঁর গবেষণাপত্র উপস্থাপনও করেন।
ভ্রমণের উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি
এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বজুড়ে একাডেমিক ও পেশাদাররা টেকসই সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য জ্ঞান অনুসন্ধান করেন এবং জার্নালে প্রকাশ করেন। যুগ যুগ ধরে এই পদ্ধতিতে জ্ঞানচর্চা হয়ে আসছে। সড়ক PIARC বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য হিসেবে অনলাইনে নিয়মিত অংশগ্রহণের সুবাদে সরাসরি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার এই সুযোগ বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল।
কিন্তু প্যারিস যাওয়ার পথে মধ্যপ্রাচ্য বাগড়া দিচ্ছিল। ইরানের ওপর চলমান যুদ্ধের কারণে কুয়েত, দুবাই, কাতার, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশের বিমানবন্দর বন্ধ ছিল। মধ্যপ্রাচ্য এড়িয়ে ভিন্ন পথে প্যারিসে যাওয়ার জন্য ইথিওপিয়া এয়ারলাইনসের ওপর ভরসা রাখা হয়। এই সুযোগে ইথিওপিয়ার রাজধানী আদিস আবাবা ছুঁয়ে দেখার অভিজ্ঞতাও হয়। ইথিওপিয়া এয়ারলাইনস আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও আধুনিক বিমানসংস্থা, যার বহরে ১৭০টি বিমান রয়েছে এবং বিশ্বের প্রায় ১৭৫টি গন্তব্যে এটি চলাচল করে। অবশেষে ৯ মার্চ সকালে প্যারিসের চার্লস দ্য গল বিমানবন্দরে পৌঁছানো যায়।
প্যারিসের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা
ছোটবেলায় অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘পারি’ প্রবন্ধ পড়ে প্যারিস শহরের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউব ভিডিওর কল্যাণে সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে। ৯ মার্চ ছিল ফ্রি ডে, কারণ সম্মেলন শুরু হবে পরের দিন। প্যারিসে নির্ধারিত হোটেলের স্টোরে লাগেজ জমা দিয়ে অল্প পয়সায় ‘ডে পাস’ সংগ্রহ করে বেরিয়ে পড়া হয়। প্যারিসের মেট্রো ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি দিয়ে চলে, যা বেশ স্বস্তিদায়ক।
মেট্রোতে করে ল্যুভর মিউজিয়ামে পৌঁছানো হয়। প্যারিসকে বিশ্বের আর্ট ও সংস্কৃতির রাজধানী বলা হয় এবং ল্যুভর তার কেন্দ্রস্থল। ভাগ্য ভালো ছিল, কারণ তাৎক্ষণিক টিকিট সংগ্রহ করে ভেতরে ঢোকার সময়স্লট পাওয়া যায়। ল্যুভর মিউজিয়াম এক বিশাল রাজ্য, যেখানে পুরো দিন কাটালে মোটামুটি সবকিছু দেখা সম্ভব। কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে মাত্র তিন ঘণ্টা ধরে যতটুকু সম্ভব দেখা হয়। অবশেষে রুম নম্বর ৭১১-এ প্রবেশ করে লেওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ‘মোনালিসা’ চোখের সামনে দেখা যায়। দেয়ালে ঝোলানো মোনালিসা খুব সাধারণ, আবার একেবারে অনন্য। মোনালিসার রুমে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় তার আবেদনের প্রমাণ দেয়।
ল্যুভর থেকে বেরিয়ে ‘গার দু নর’-এ যাওয়া হয়, যাকে লিটল বাংলাদেশ ডাকা হয়। সেখানে এক বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় ইফতার করা হয়। আইফেল টাওয়ার রাত ৯টার দিকে দেখা হয়, যখন লাইট শো চলছিল। রাতে আইফেল টাওয়ার অপ্সরীর রূপে ধরা দেয়, যা সত্যিই আনন্দের বিষয় ছিল।
চেম্বারি সম্মেলন ও টেকনিক্যাল আলোচনা
প্যারিস থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে ছোট শহর চেম্বারিতে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। চেম্বারির চারপাশে বিস্তৃত আল্পস পর্বতমালা অবস্থিত। ১১ শতকে ফ্রান্স ও ইতালির অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত স্যাবিও রাজ্যের রাজধানী ছিল চেম্বারি। সম্মেলনের ভেন্যু স্যাবিও-এক্সপোতে প্রবেশ করার সময় PIARC-এর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েলা স্টোচি উদ্বোধনী মঞ্চে ছিলেন। সামনে উপস্থিত ছিলেন ৫০টি দেশের প্রায় দুই হাজার বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধি।
বিশ্বজুড়ে আসা জ্ঞানী মানুষদের ভিড়ে নিজেকে খুঁজে পাওয়া এবং তাদের সঙ্গে ভাবনার আদান-প্রদান এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা ছিল। সম্মেলনের প্রতিটি সেশনে ভবিষ্যতের সড়কব্যবস্থার রূপরেখা উঠে এসেছে, যেখানে পরিবেশ, প্রযুক্তি ও মানুষের প্রয়োজন একসূত্রে গাঁথা। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা থেকে শুরু করে টেকসই অবকাঠামো গড়ার নানা চিন্তা নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। টেকনিক্যাল ভিজিটে বৈদ্যুতিক সড়কের ধারণা দেখে মনে হয়েছে, সড়ক আর শুধু চলার পথ নয়, বরং এক জীবন্ত ও বুদ্ধিমান ব্যবস্থা।
চেম্বারির দিনগুলি ও ঘটনাবলি
দিনের প্রোগ্রাম শেষ হলে শহর দেখার জন্য বেরিয়ে পড়া হয়। দলনেতা মাহবুবের ইউরোপীয় খাবার সম্পর্কে ব্যাপক জানাশোনা ছিল, তিনি প্রতিটি বেলার খাবার ঠিক করে দিতেন। একদিন রেলস্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় দুজন পুলিশ সদস্য কাছে এসে আইডি কার্ড দেখতে চান। পাসপোর্ট ও ভিসা দেখে তারা শান্ত হন। সম্ভবত স্টেশনের সামনে ভবঘুরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাদের সন্দেহ হয়েছিল।
আরেকটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য: ডিনার সেরে হোটেলে ফিরে চাবি দিয়ে তালা খুলতে না পারায় অনেকক্ষণ চেষ্টা করার পর শেষে গেটের এক পাশে ফোন নম্বর পেয়ে সমস্যার সমাধান করা হয়। চেম্বারির প্রধান গির্জা ১৬ শতকে নির্মিত, যার ভেতরে ঢুকে ধর্মীয় আলোচনা শোনা হয়।
সমাপ্তি ও প্রত্যাবর্তন
সম্মেলন শেষ হয়ে আসার পর হাতে বেশ কিছু সময় থাকে। চেম্বারির অধ্যায় শেষ করে অন্য গন্তব্যের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়া হয়। এই সফর শুধু একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণ নয়, বরং শেখার, দেখার এবং নতুন স্বপ্ন বুনে ফেরার এক অনন্য ভ্রমণ ছিল। ভবিষ্যতের পৃথিবী আরও স্মার্ট, সবুজ ও মানবিক হতে চলেছে—এই বিশ্বাস নিয়ে প্রত্যাবর্তন করা হয়।
লেখক: সাজিদ রহমান, প্রকৌশলী



