প্যারিস ভ্রমণ: আইফেল টাওয়ার থেকে নটরডেম ক্যাথেড্রালের অপূর্ব স্মৃতি
প্যারিস ভ্রমণ: আইফেল টাওয়ার ও নটরডেমের স্মৃতি

প্যারিস ভ্রমণ: একটি স্বপ্নের শহরের অপূর্ব অভিজ্ঞতা

প্যারিস ভ্রমণ—আমার জীবনের কয়েকটি বিশেষ দিন, যা এখনো মনে পড়লে হৃদয় ভরে যায়। ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর, স্টুটগার্ট, জার্মানি থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে ফ্রান্সের দ্রুততম টিজিভি ট্রেনে যাত্রা শুরু করি। মাত্র তিন ঘণ্টায় পাঁচ শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্বপ্নের শহর প্যারিসে পৌঁছালাম। স্টেশনে নেমে আমরা পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় ব্যস্ত এলাকা বৌলভার্ড হাউসমানে পূর্বেই বুকিং দেওয়া এয়ার বিএনবির একটি সুন্দর অ্যাপার্টমেন্টে ছয় দিনের জন্য উঠলাম। আসার পথে ঝলমলে রাস্তা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন বন্দী হয়ে পড়ছি প্যারিস শহরের ইতিহাস আর অপরূপ সৌন্দর্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধনের মধ্যে।

ভ্রমণের চতুর্থ দিন: আইফেল টাওয়ারের রোমাঞ্চ

ভ্রমণের চতুর্থ দিন, ১৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে, আনিকা ও অনিত আমাকে প্রাতরাশ করতে নিয়ে গেল বিখ্যাত ‘লা মোমে’ নামের এক ফ্রেঞ্চ বেকারিতে। ফ্রান্সের বেকারির তৈরি বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার যুগ যুগ ধরে বিশ্বে খ্যাতি বজায় রেখেছে। আমরা সুস্বাদু নাশতা শেষ করে বাসে যাত্রা শুরু করলাম, প্রথম গন্তব্য ছিল বিশ্ববিখ্যাত আইফেল টাওয়ার। সুউচ্চ এই টাওয়ারকে দূর থেকে দেখলে যতটা রোমাঞ্চকর মনে হয়েছিল, কাছে গিয়ে দাঁড়াতে ততটাই ভীতিজনক লাগছিল। অনেক লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে বিশাল উঁচু কাঠামোর দিকে তাকিয়ে মাথা চক্কর খাচ্ছিল, এত ওপরে ওঠার সাহস আমার ছিল না। টাওয়ারের উঁচুতে উঠতে জনপ্রতি ৭০ ইউরোর টিকিট, তাই টাওয়ারের ওপরে ওঠার ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আর ওঠা হলো না। নিচে থেকেই তার সৌন্দর্য উপভোগ করলাম।

এবারেও আমার ভ্রমণসঙ্গী ছিল আনিকা, অনিত ও তিন মাসের ছোট্ট নাতনি রূপকথা। ছোট্ট রূপকথার নিষ্পাপ মুখ আর তার শান্ত উপস্থিতি আমাদের পুরো ভ্রমণটাকে আরও বেশি মধুর করে তুলেছিল। মাঝেমধ্যে তাকে কোলে নিয়ে চারপাশের দৃশ্য দেখাতে দেখাতে মনে হচ্ছিল, এই স্মৃতিগুলো একদিন ওর জন্যও গল্প হয়ে থাকবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শেইন নদীর ভ্রমণ ও নটরডেম ক্যাথেড্রালের ইতিহাস

প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে আইফেল টাওয়ার দর্শন শেষে যাত্রা শুরু করলাম শেইন নদীর দিকে। অত্যন্ত সাজানো–গোছানো পর্যটন জাহাজে করে ভ্রমণ শুরু হলো। পর্যটন জাহাজ থেকে দুই ধারের দৃশ্য দেখতে দেখতে আমার সহধর্মিণী পেছনের খোলা জায়গায় ছবি তোলার সময় বাতাসের তীব্রতায় লন্ডন থেকে কেনা তাঁর খুব শখের ফারের ক্যাপটি মাথা থেকে উড়ে যায়। তাঁর দুঃখে আমরা কিঞ্চিত হাসছিলাম।

ভ্রমণের সময় দূর থেকে চোখে পড়ল নটরডেম ক্যাথেড্রাল, ইতিহাসের এক মহিমান্বিত নিদর্শন। দূর থেকে তার গম্ভীর অবয়ব যেন শতাব্দীর গল্প শোনাচ্ছিল। শেইন নদীর দুই ধারে সাড়ি সাড়ি দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক স্থাপনা। নদীর ওপরে একটার পর একটি ব্রিজ পার হয়ে আমাদের মূল গন্তব্য নটরডেম ক্যাথেড্রালে পৌঁছালাম। ঐতিহাসিক এই চার্চকে কাছ থেকে দেখে তার সৌন্দর্যে আরও বেশি মুগ্ধ হলাম। ক্যাথেড্রালের সামনের বিশাল এলাকাজুড়ে হাজারো পর্যটকের ভিড়। দেখলাম সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কিনে চার্চের ভেতরে প্রবেশ করছেন দর্শনার্থীরা। অবশ্য তিনটার কিছু পরে মূল ফটক উন্মুক্ত করে দেয়, সেই সুযোগে আমরাও চার্চের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ নিই।

চার্চের বিশাল দরজা, খোদাই করা ভাস্কর্য আর ভেতরের পবিত্র পরিবেশ মনে গভীর ছাপ রেখেছে। এর ভেতরে ঢুকে রঙিন কাচের জানালা দিয়ে আসা আলো দেখে মনে হচ্ছিল, এ যেন এক নীরব, পবিত্র জগৎ। প্রার্থনার বিশাল সুনসান হলঘরটিতে পিনপতন নীরবতা, কেবল এক–দুবার চার্চের ঘণ্টার শব্দ শোনা যায়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, নটরডেম ক্যাথেড্রালের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ১১৬৩ সালে, ফ্রান্সের রাজা ৭ম লুই–এর শাসনামলে। নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্যারিসের বিশপ মরিস ডি সাল্লি। এটি সম্পূর্ণ হতে প্রায় ২০০ বছর সময় লেগেছিল এবং ১৩৪৫ সালে এর কাজ শেষ হয়। এই গির্জা গথিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত, যেখানে উঁচু খিলান, রঙিন কাচের জানালা এবং বিখ্যাত ‘Flying Buttress’ ব্যবহৃত হয়েছে। মধ্যযুগে এটি ছিল ফ্রান্সের প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। ১৮০৪ সালে এখানে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট নিজেকে ফ্রান্সের সম্রাট হিসেবে অভিষেক করেন। বহু রাজকীয় অনুষ্ঠান, বিবাহ এবং রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান এই গির্জায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত গির্জা এবং প্যারিস শহরের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক।

ক্যাথেড্রালের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, যেন শত শত বছরের ইতিহাস আমার সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বিশাল দরজা, সূক্ষ্ম খোদাই করা ভাস্কর্য, আর উঁচু টাওয়ার—সবকিছুই ছিল বিস্ময়কর। গথিক স্থাপত্যশৈলীর সেই অসাধারণ নিদর্শনটি যেন মানুষের সৃষ্টির এক চূড়ান্ত শিল্পকর্ম। চার্চের ভেতরে প্রবেশ করে আমি যেন এক অন্য জগতে চলে গেলাম। ভেতরের নীরবতা, অনেক উঁচু ছাদ আর রঙিন কাচের জানালা দিয়ে আসা আলো একধরনের পবিত্র অনুভূতি সৃষ্টি করছিল। রোজ উইন্ডো দিয়ে আসা রঙিন আলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে যেন এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করছিল। মনে হচ্ছিল, সময় যেন এখানে থমকে আছে। চার্চের প্রতিটি পাথরনির্মিত কোণ যেন গল্প বলে—ধর্ম, ইতিহাস আর মানুষের বিশ্বাসের গল্প।

ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-১৭৯৯) চলাকালে ক্যাথেড্রালটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর অনেক ভাস্কর্য ধ্বংস করা হয় এবং গির্জার মূল্যবান সম্পদ লুটপাট হয়। কিছু সময়ের জন্য এটি গুদামঘর হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছিল। কিছুটা ধ্বংসের চিহ্ন থাকলেও সেটি তার সৌন্দর্যকে কমায়নি; বরং আরও গভীরতা দিয়েছে।

লেখক ভিক্টর হুগো ১৮৩১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য হান্সবাক অব নটর–ডেম’ প্রকাশ করলে গির্জাটির প্রতি বিশ্বজুড়ে মানুষের আগ্রহ পুনরায় বৃদ্ধি পায়। এরপর স্থপতি Eugène Viollet-le-Duc –এর নেতৃত্বে বড় ধরনের সংস্কারকাজ শুরু হয়।

২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল দুর্ভাগ্যজনকভাবে নটরডেম ক্যাথেড্রালের ওপরের অংশে এক ভয়াবহ আগুন লাগে। এতে গির্জার ছাদ ও বিখ্যাত চূড়া ধ্বংস হয়ে যায়। এ ঘটনা বিশ্বব্যাপী খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের দুঃখের কারণ হয় এবং পুনর্নির্মাণের জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে এই ক্যাথেড্রাল পুনর্নিমাণের কাজ চলছে। লক্ষ্য হলো এটিকে আগের মতো পুনরুদ্ধার করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা। তবে আমার মনে হয়, আধুনিক সংস্কার করে গির্জার চূড়ায় শত শত বছর আগেকার সেই কাঠের খোদাইকৃত কারুকার্য আর কোনো দিনই ফিরে পাবে না।

ভালোবাসার তালা ও রাতের আইফেল টাওয়ার

নটরডেম গির্জার কাছে সাড়ি সাড়ি তালা ঝোলানোর অর্থকুসংস্কার কেবল আমাদের দেশেই সীমাবদ্ধ নয়, এ দেশটিতেও এর গভীর ছোঁয়া দেখলাম। অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম, নটরডেম ক্যাথেড্রালের আশপাশে এবং সামনে শেইন নদীর সেতুগুলোর রেলিংয়ে সারি সারি তালা ঝোলানো। এগুলোকে বলা হয় ভালোবাসার তালা। এই তালাগুলো মূলত প্রেম ও অঙ্গীকারের প্রতীক। প্রেমিক-প্রেমিকা বা দম্পতিরা একটি তালায় নিজেদের নাম লিখে সেটি সেতুর রেলিংয়ে লাগিয়ে দেন, তারপর চাবিটি নদীতে ফেলে দেন। এর মাধ্যমে তাঁরা বোঝাতে চান, তাঁদের ভালোবাসা চিরস্থায়ী, কখনো ভাঙবে না। ধারণা করা হয়, এই রীতি ইউরোপের অন্যান্য দেশ, বিশেষ করে ইতালি থেকে শুরু হয়ে পরে প্যারিসে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এটি পর্যটকদের মধ্যে একটি রোমান্টিক ট্রেন্ডে পরিণত হয়। হাজার হাজার তালার ওজন সেতুর ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এমনকি ২০১৪ সালে পন্ট ডি আর্টসের একটি অংশ তালার ভারে ভেঙে পড়েছিল। এরপর কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার জন্য কয়েক টন তালা সরিয়ে ফেলেছিল। এখন আগের মতো এত তালা ঝোলানো যায় না, তবে এই ভালোবাসার তালার ধারণাটি এখনো পর্যটকের কাছে খুব জনপ্রিয় এবং স্মৃতির অংশ।

নটরডেম দর্শন শেষে রাতের আলোতে আরেক রূপে আইফেল টাওয়ার দেখতে ফিরছিলাম। বিকেলের নরম আলোয় নদীর দুই পাশের দৃশ্য যেন একেকটা জীবন্ত চিত্রকর্ম। প্রায় দুই ঘণ্টা সেই রিভার ক্রুজে কাটালাম—নীরব, শান্ত আর গভীর এক অনুভূতির মধ্যে। সন্ধ্যা নামতেই আমরা আবার ফিরে এলাম আইফেল টাওয়ারের খুব কাছে। এবার সেই একই টাওয়ার যেন সম্পূর্ণ অন্য রূপে ধরা দিল, ঝলমলে আলোয় সেজে উঠেছে পুরোটা। রাতের অন্ধকারে টাওয়ারের সেই আলোকসজ্জা ছিল সত্যিই অবর্ণনীয়। মনে হচ্ছিল, দিনের ভয় আর দ্বিধা সব মুছে গিয়ে শুধু বিস্ময় আর সৌন্দর্যই রয়ে গেছে।

রাতের আলোয় আইফেল টাওয়ারের বেশ কিছু ছবি তুলে রাত প্রায় ১২টার দিকে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এলাম। দিনের ক্লান্তি থাকলেও মন ছিল পরিপূর্ণ—স্মৃতি, অনুভূতি আর ভালোবাসায় ভরা। এই একটি দিন যেন আমাকে শিখিয়েছে—ভ্রমণ শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়, বরং নিজের অনুভূতিগুলোকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা। প্যারিসের সেই দিন তাই আমার কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক: শাহ জালাল ফিরোজ, হেলেবাড, স্টুটগার্ট, জার্মানি