মালাক্কা ভ্রমণে লিভারক্রুজ বন্ধ, পর্যটকদের জন্য অপেক্ষার পালা
এবার মালাক্কা শহরে এসে দেখা গেল, এখানকার অন্যতম আকর্ষণ লিভারক্রুজ বন্ধ রয়েছে। লিভারক্রুজ বন্ধ থাকায় আশেপাশের এলাকায় পর্যটকদের জন্য বিনোদনের সমস্ত ব্যবস্থা স্থগিত। লিভারক্রুজ বন্ধ থাকার সম্ভাব্য কারণ হলো, পর্যটন এলাকাটি সংস্কারের আওতায় আসছে। সংস্কারের মাধ্যমে ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুনত্ব ও অভিনবত্বের সংযোগ ঘটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যাঁরা আগে এসে এখানকার রঙিন সৌন্দর্য উপভোগ করেছিলেন, তাঁরা যেন আবারও ফিরে আসতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। সংস্কার শেষ হলে মালাক্কা শহরে বয়ে চলা মালাক্কা নদীর নবরূপ দেখা হবে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। তবে এবার নদী এলাকায় সবকিছু বন্ধ থাকায় ভ্রমণকারীদের মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল কিছুটা।
মালয় রেস্তোরাঁয় স্বাদযুক্ত খাবারের অভিজ্ঞতা
নদীর ওপারে মালয় তমিয়াম রেস্তোরাঁয় বসে আমরা খাবারের আনন্দ উপভোগ করলাম। আমাদের সভাপতি আমিনুল ইসলাম রতন ভাই, যিনি মালয়েশিয়ায় দীর্ঘ ৩০ বছর আছেন, মালয় খাবারের স্বাদ সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞতা রাখেন। তিনি সাদা ভাত, ডিম ভাজি, শাক ভাজি, সবজি, সামুদ্রিক কোরাল মাছের তিগা রাসা, স্যুপ তমিয়াম সি-ফুড, আয়াম কুনিদ ও চার প্রকারের জুস অর্ডার করলেন।
কুয়ালালামপুরে মালয় খাবার ও সি-ফুডের জন্য বিখ্যাত এলাকা কামপুং বারু, কিন্তু মালাক্কার এই রেস্তোরাঁয় একই খাবার কম দামে এবং স্বাদে কামপুং বারুর চেয়ে অনেক ভালো পাওয়া গেল। সবাই রাতের খাবারে তৃপ্তি পেয়েছেন, অনেক দিন পর মজাদার সি-ফুড ও তমিয়াম খাওয়ার সুযোগ মিলল।
ক্ল্যাবাং সৈকতে মধ্যরাতের স্মৃতিমুখর আয়োজন
রাতের খাওয়ার পর আমরা ক্ল্যাবাং বিচে ঘুরতে গেলাম, যা মূল শহর থেকে আধাঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। ক্ল্যাবাং সৈকত শান্ত প্রকৃতির, কক্সবাজারের মতো বড় ঢেউ বা গর্জন নেই, কিন্তু রাতজাগা মানুষের আনাগোনায় প্রাণবন্ত। মধ্যরাতেও সৈকতের বালুচরে অনেক মানুষ উপস্থিত ছিলেন, যার মধ্যে শিশু থেকে বড় সবাই ছিলেন।
সৈকতে তরুণরা আতশবাজি নিক্ষেপ করছিল সমুদ্রজলে, যা জলেও আলোকোজ্জ্বল আভা ছড়াচ্ছিল। আতশবাজির ঝলকানিতে আকাশ আলোকিত হয়ে উঠছিল, আর সৈকতের বিশাল চালুচর পেরিয়ে ঝাউবাগান পর্যন্ত আওয়াজে মুখরিত ছিল। মূল সড়কের দুই পাশে প্লে গ্রাউন্ডে নানা মজার রাইডস ও খেলার আয়োজন ছিল, যা বৈশাখী মেলা বা বিজয় মেলার মতো মনে হচ্ছিল।
সৈকতের বালুচরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটি ফাটা টায়ারের কাছে বসে গানের আসর শুরু করলাম। নব্বই দশকের গান থেকে শুরু করে হালের আলোচিত গান গেয়ে শোনানো হলো। বয়সে সিনিয়র আমিন ভাই প্রেমের গান গেয়ে তারুণ্যের দিনে ফিরে গেলেন, আর তরুণরা নতুন গান দিয়ে তাঁদের উদ্ধার করলেন। মধ্যরাতে মালাক্কার ক্ল্যাবাং সৈকতে নাচে-গানে-কৌতুক, হাসি-ঠাট্টা ও কথামালায় স্মরণীয় একটি অধ্যায় শেষ করে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম।
মসজিদ সেলাত: আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন
পরদিন আমরা মসজিদ সেলাত পরিদর্শন করলাম, যা মালাক্কার প্রাদেশিক মসজিদ বা প্রধান মসজিদ হিসেবে পরিচিত। সাগরের কূল ঘেঁষে জলের ওপরে নির্মিত এই মসজিদটি ভাসমানের মতো দেখায়, এবং এর স্থাপত্যশৈলী খুবই চমৎকার। দেশি-বিদেশি অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন মসজিদ সেলাত পরিদর্শন করতে আসেন, বিশেষ করে পড়ন্ত বিকেলে এটি দারুণ উপভোগ্য হয়।
মসজিদ সেলাত মালাক্কা শহরের অদূরে কামপুং বান্দার হিলিরে ২০০৬ সালে নির্মিত হয়, এবং ২০ বছর পরেও নতুনের মতোই রয়েছে। সমুদ্রে পানির স্তর বেড়ে গেলে মসজিদটিকে পুরোপুরি ভাসমান দেখায়। এর সামনের খোলা মাঠ ও সবুজ গাছের ছায়ায় কাঠের বৈঠকখানা বসে মসজিদের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়, আর গোধূলিবেলায় সূর্যাস্ত দেখার পর মাগরিবের নামাজ আদায় করে ফিরে আসা যায়।
মালাক্কা ভ্রমণে লিভারক্রুজ বন্ধ থাকলেও ক্ল্যাবাং সৈকত ও মসজিদ সেলাতের মতো স্থানগুলো ভ্রমণকে করেছে সমৃদ্ধ ও স্মরণীয়। পর্যটকদের জন্য অপেক্ষার মধ্যে নতুন অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা মালাক্কার ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংমিশ্রণকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।



