পাহাড়চূড়ার ১০০ ফুট লম্বা সিংহ শয্যা বুদ্ধমূর্তি পর্যটকদের আকর্ষণ করছে
রামুর সিংহ শয্যা বুদ্ধমূর্তি পর্যটকদের আকর্ষণ করছে

পাহাড়চূড়ার ১০০ ফুট লম্বা সিংহ শয্যা বুদ্ধমূর্তি পর্যটকদের আকর্ষণ করছে

কক্সবাজারের রামু উপজেলার উত্তর মিঠাছড়ির পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত প্রাচীন বৌদ্ধবিহার বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রে দেশের সর্ববৃহৎ ১০০ ফুট লম্বা সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধ মূর্তি পর্যটকদের নজর কাড়ছে। সম্প্রতি মূর্তির পথে ওঠার সিঁড়ির দুই পাশে ৩৯টি নতুন বুদ্ধমূর্তি স্থাপনের পর দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০০ পর্যটক পাহাড়চূড়ায় উঠে এই অনন্য স্থাপনা ঘুরে দেখছেন। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে এখানে আসছেন।

সিংহ শয্যা নামের তাৎপর্য

বিহারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক করুণাশ্রী মহাথের ব্যাখ্যা করেন, সিংহ শয্যা নামটির একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সিংহ ডান কাতে শুয়ে সতর্ক অবস্থায় ঘুমায়। গৌতম বুদ্ধও ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ডান পাশে শুয়ে, ডান হাতের ওপর মাথা রেখে বিশ্রাম নিতেন। সেই ভঙ্গিমা অনুসরণ করেই মূর্তিটির নামকরণ করা হয়েছে সিংহ শয্যা। তিনি বলেন, বুদ্ধত্ব লাভের আগে দীর্ঘ সময় ধরে বুদ্ধ এভাবেই ধ্যানচর্চা করতেন। সে চিত্রই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

নির্মাণের ইতিহাস ও হামলার ঘটনা

এই বিশাল মূর্তি নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন করুণাশ্রী মহাথের নিজেই। ২০০৬ সালে মিয়ানমার থেকে দক্ষ কারিগর এনে শুরু হয় নির্মাণকাজ। শুরুতে ব্যক্তিগত অর্থে কাজ শুরু হলেও পরে ভক্তদের অনুদান ও বিদেশ থেকে আসা সহায়তায় কাজ এগিয়ে চলে। মূর্তিটির দৈর্ঘ্য ১০০ ফুট, উচ্চতা ৫০ ফুট ও প্রস্থে ২২ ফুট। মাথা দক্ষিণ দিকে এবং পা উত্তর দিকে রেখে নির্মাণ করা হয়েছে এটি। ২০১২ সালের আগস্টে মূল কাঠামোর কাজ শেষ হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে এ মূর্তির উদ্বোধনের আগেই ঘটে যায় এক ভয়াবহ ঘটনা। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কয়েক শ দুর্বৃত্ত লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে বৌদ্ধবিহার ও মূর্তির ওপর হামলা চালায়। অগ্নিসংযোগে পুড়িয়ে দেওয়া হয় বিহারটি। মূর্তির ভেতরে ঢুকে ককটেল বিস্ফোরণও ঘটানো হয়। করুণাশ্রী মহাথের স্মরণ করে বলেন, রাত প্রায় দুইটার দিকে হঠাৎ হামলা শুরু হয়। আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি, এমন কিছু ঘটবে। প্রাণভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যাই। মনে হয়েছিল যে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। সকালে এসে দেখি, বিহার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু বুদ্ধমূর্তিটি টিকে আছে। তখন মনে হয়েছে, কোনো অদৃশ্য শক্তি হয়তো এটিকে রক্ষা করেছে। পরবর্তী সময়ে সরকার ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনর্গঠন করা হয়। সিংহশয্যা বুদ্ধমূর্তিটিও সংস্কার করে সোনালি রঙে নতুনভাবে সাজানো হয়।

নতুন উন্নয়ন প্রকল্প ও পর্যটন সম্ভাবনা

বিহার এলাকায় প্রায় দুই একর জায়গাজুড়ে নেওয়া হয়েছে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প। এর আওতায় একটি পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাওয়ার জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ২০০ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু। সেতুর শেষ প্রান্তে তৈরি হবে ১২০ ফুট উচ্চতার একটি স্বর্ণজাদি। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে পাইলিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। অনুদানের অর্থেই ধাপে ধাপে এগোচ্ছে নির্মাণ।

করুণাশ্রী মহাথের বলেন, আমার স্বপ্ন ছিল এমন একটি বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করা, যা বাংলাদেশে অনন্য হবে। কক্সবাজারে প্রতিবছর লাখো পর্যটক আসেন। তাঁদের সামনে বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্য তুলে ধরা এবং পর্যটনকে আরও সমৃদ্ধ করাই ছিল মূল লক্ষ্য। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি এই স্থান দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশা করছি।

দর্শনার্থীদের প্রতিক্রিয়া

কুমিল্লা থেকে আসা ব্যবসায়ী নাজমুল হুদা বলেন, কক্সবাজারে ঘুরতে এসে এই বুদ্ধমূর্তির কথা জানতে পারি। এত বড় বুদ্ধমূর্তি দেশে আগে কোথাও দেখিনি। ঢাকার শ্যামলী এলাকার স্কুলশিক্ষক রুপালী চাকমা বলেন, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙামাটিতে অনেকবার গিয়েছি। কিন্তু এমন বিশাল ও ভিন্নধর্মী বুদ্ধমূর্তি আগে কোথাও চোখে পড়েনি। গৌতম বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এখানে আসা।

বৌদ্ধবিহারে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন প্রধান ফটক। সেখান থেকে পাহাড়চূড়ায় উঠতে রয়েছে ৮৮ ধাপের প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ পাকা সিঁড়ি। এই সিঁড়ির দুই পাশে নতুন করে বসানো হয়েছে ৩৯টি বুদ্ধমূর্তি। এর মধ্যে উত্তর পাশে সারিবদ্ধভাবে রয়েছে ২১টি দাঁড়ানো মূর্তি, প্রতিটির উচ্চতা ৭ ফুট। আর দক্ষিণ পাশে রয়েছে ১৮টি বসা মূর্তি, প্রতিটির উচ্চতা ৪ ফুট। মিয়ানমারের কারিগরদের দিয়ে তিন বছরে এসব মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। বিহারের ভিক্ষু, শ্রমণ ও সেবকেরা এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করছেন।