ব্রাজিলের ক্যান্ডিডো গডয়: যমজদের এক অনন্য গ্রাম
দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো রাজ্যে অবস্থিত ক্যান্ডিডো গডয় একটি ছোট্ট ও শান্ত গ্রাম। প্রথম নজরে এটি সাধারণ মনে হলেও, এখানে হাঁটাহাঁটি করলেই চোখে পড়বে একই রকম দেখতে মানুষের জোড়া। গ্রামটির চারপাশ সবুজে ঘেরা, কিন্তু এর আসল বৈশিষ্ট্য হলো যমজ সন্তানদের অস্বাভাবিক উচ্চ হার।
যমজ জন্মের অসাধারণ পরিসংখ্যান
সাধারণভাবে বিশ্বে প্রতি ৮০টি জন্মে মাত্র একটি যমজ সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু ক্যান্ডিডো গডয়ে এই হার একেবারেই ভিন্ন। এখানে প্রতি পাঁচটি জন্মের মধ্যে প্রায় একটি যমজ সন্তান। অর্থাৎ, গ্রামের স্কুলে গেলে একই রকম দেখতে দুজন সহপাঠী পাওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। এমনকি শিক্ষকরাও প্রায়ই ভুল করে ফেলতে পারেন কে আসল আর কে যমজ!
বিজ্ঞান কী বলে?
বিজ্ঞানীরা এই গ্রামে যমজ জন্মের উচ্চ হারের কারণ খুঁজতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়েছেন। তা হলো জিন বা বংশগত বৈশিষ্ট্য। বহু বছর আগে, কিছু পরিবার এই গ্রামে বসবাস শুরু করে, যাদের মধ্যে যমজ হওয়ার প্রবণতা বেশি ছিল। পরবর্তীতে, এই পরিবারগুলোর সদস্যদের মধ্যেই বিয়ের প্রচলন বেড়ে যায়, ফলে সেই বিশেষ জিন পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা এটিকে ‘ফাউন্ডার ইফেক্ট’ বলে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে একটি ছোট জনগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য সময়ের সাথে সম্প্রসারিত হয়।
নাৎসি ডাক্তারের রহস্যময় গুজব
এই গ্রামকে ঘিরে একটি ভয়ংকর গুজবও প্রচলিত আছে। অনেকে দাবি করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জোসেফ মেঙ্গেলে নামে এক নাৎসি ডাক্তার এখানে এসে যমজ শিশুদের উপর ভয়াবহ পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। গল্পটি বলে, তার কার্যক্রমের ফলেই গ্রামে যমজের সংখ্যা বেড়ে গেছে। তবে বিজ্ঞানীরা এই গল্পকে সত্য বলে মানেন না, কারণ এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এটি শুধুমাত্র একটি রহস্যময় গুজব হিসেবেই বিবেচিত হয়।
গ্রামবাসীদের দৃষ্টিভঙ্গি
বাইরের দর্শনার্থীদের জন্য এই ঘটনা অবাক করার মতো হলেও, ক্যান্ডিডো গডয়ের বাসিন্দাদের কাছে এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। তারা ছোটবেলা থেকেই যমজদের সাথে বড় হয়েছেন, তাই এটিকে নতুন কিছু মনে করেন না। তবে বাইরে থেকে আসা মানুষজন প্রায়ই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন, কে আসল আর কে যমজ তা বুঝতে তাদের সময় লাগে। মজার ঘটনাও ঘটে, যেমন কেউ একজনকে ডেকে কথা বলার পর বুঝতে পারেন তিনি তার যমজ ভাই বা বোন!
যমজদের বিশেষ আয়োজন
গ্রামে মাঝে মাঝে যমজদের জন্য বিশেষ মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে অনেক যমজ একসাথে জড়ো হয়ে ছবি তোলে, গল্প করে এবং খেলাধুলা করে। কল্পনা করুন, একই জায়গায় অনেকগুলো একই রকম মুখ দেখলে কেমন লাগতে পারে! এটি গ্রামের একটি অনন্য ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রহস্যের অবশিষ্টাংশ
বিজ্ঞান জিনগত কারণ ও ফাউন্ডার ইফেক্ট দিয়ে অনেকটাই ব্যাখ্যা দিলেও, ক্যান্ডিডো গডয় এখনো কিছুটা রহস্যময়ই রয়ে গেছে। কারণ, পৃথিবীর অন্য কোথাও এত বেশি যমজ একসাথে দেখা যায় না। এই ছোট্ট গ্রামটি তাই বিজ্ঞানীদের জন্য একটি কৌতূহলোদ্দীপক গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে টিকে আছে, যেখানে প্রতিনিয়ত নতুন তথ্য ও অন্তর্দৃষ্টি যোগ হচ্ছে।



