ঈদের ছুটিতে আহসান মঞ্জিলে মানুষের ঢল, ইতিহাসের টানে ভিড়
পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিতে রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা আহসান মঞ্জিলেও মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটেছে। সোমবার বেলা ১টায় পুরান ঢাকার এই প্রাসাদসদৃশ স্থাপনার প্রবেশদ্বারে দেখা গেছে, লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছেন।
দর্শনার্থীদের উৎসাহ ও অভিজ্ঞতা
গোলাপি দেয়াল ও নবাবি আমলের নিদর্শন দেখতে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই ছুটে এসেছেন। কেউ এসেছেন রাজধানী থেকে, আবার কেউ পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে—শুধু ইতিহাসকে কাছ থেকে ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষায়। প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্য নুর ইসলাম জানান, সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় শুরু হয়েছে এবং দুপুরের পর তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন, সাপ্তাহিক ছুটি বৃহস্পতিবার।
ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক ভিন্ন দৃশ্য। আহসান মঞ্জিলের ঐতিহাসিক সিঁড়ি, প্রশস্ত মাঠ ও গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে তরুণ-তরুণীরা ছবি তুলছেন। কেউ আবার পরিবারের সবাইকে নিয়ে মুহূর্তগুলো স্মৃতিবন্দী করছেন। যদিও নিদর্শনে হাত দেওয়া বা ছবি তোলার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে, তবু অনেকে সেই নিয়ম অমান্য করে শত বছরের পুরোনো স্মৃতি ছুঁয়ে দেখছেন এবং ছবি তুলছেন।
পরিবারগুলোর প্রতিক্রিয়া ও শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা
রাজধানীর মিরপুর থেকে আসা রাশেদ মাহমুদ তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে এক গ্যালারি থেকে আরেক গ্যালারিতে ঘুরছেন। পুরোনো আসবাবের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে বাচ্চাদের নিয়ে একটু ভিন্ন কিছু দেখাতে চেয়েছিলাম। বইয়ে পড়া ইতিহাসটা ওরা এখানে এসে বাস্তবে দেখছে—এটাই বড় পাওয়া।’ তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তার স্ত্রী নাজিয়া রহমান যোগ করেন, ‘জায়গাটা শুধু ঘোরার নয়, শেখারও। এত সুন্দর করে সংরক্ষণ করা হয়েছে—তবে ভিড় একটু বেশি হওয়ায় ঠিকমতো সব দেখা যায় না।’
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা সুমাইয়া আক্তার একটি পুরোনো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ছবি তুলছিলেন। তিনি বলেন, ‘ছোটকাল থেকে শুনে আসছি, আহসান মঞ্জিলের কথা। আজ এসে মনে হচ্ছে, যেন ইতিহাসের ভেতরে ঢুকে পড়েছি।’ ভবনের ভেতরে বিভিন্ন নিদর্শন বিস্ময়ের সঙ্গে দেখছিল ছোট্ট মেয়ে তানহা, বয়স মাত্র ৮। দেয়ালে টাঙানো ছবির দিকে তাকিয়ে সে বলে, ‘এগুলো কি সত্যি আগের সময়ের? রাজা-বাদশাহরা থাকত এখানে?’ তার ছোট ভাই আরিয়ানও উৎসাহ নিয়ে যোগ করে, ‘আমি এত বড় বাড়ি আর দেখিনি।’
ভিড়ের চাপ ও সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন
ভিড়ের চাপে অনেক সময়ই স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। নিরাপত্তাকর্মীরা বারবার সতর্ক করলেও কিছু দর্শনার্থী নিদর্শনে হাত দিচ্ছেন এবং নিষিদ্ধ জায়গায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। এতে ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা আরিফ হোসেন তার পরিবারের ৯ সদস্যকে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এসেছি। দূরে কোথাও সবাইকে নিয়ে যেতে হলে অনেক সময় ও খরচের প্রয়োজন। কিন্তু এখানে ছোটরা ইতিহাস জানবে।’
তবে তিনি অভিযোগ করেন, ১৫ বছর আগে তিনি আহসান মঞ্জিলে এসেছিলেন, তখন খাবারের প্লেটগুলো পিতলের ছিল, কিন্তু এখন মেলামাইন বা কাচের দেখা যাচ্ছে। আরিফ হোসেন বলেন, ‘সব মিলিয়ে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে আহসান মঞ্জিলকে আরও পরিপাটি করা যেতো। ভালো রক্ষণাবেক্ষণ থাকলে মানুষের আগ্রহ আরও বেশি থাকত।’ তার মেয়ে আনাবিয়া, যে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে, বলে, ‘আমি সব পুরোনো দিনের জিনিস দেখেছি। নবাবদের ব্যবহার করার আসবাব, খাট, তলোয়ার অনেক কিছু। দেখে ভালো লেগেছে। মনে হচ্ছে, আমি সেই সময় থেকে ঘুরে এলাম।’
সব কোলাহলের মধ্যেও আহসান মঞ্জিল যেন তার নিজস্ব মহিমা ধরে রেখেছে। নবাবি আমলের ইতিহাস, স্থাপত্যের সৌন্দর্য আর মানুষের আগ্রহ—সব মিলিয়ে ঈদের ছুটিতে এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য মিলনমেলা, যেখানে ইতিহাসের স্পর্শ খুঁজছে হাজারো মানুষ।



