ঈদে বাড়ি ফেরার পথে ঝুঁকি: ট্রাক-পিকআপে জীবনের বাজি রেখে যাত্রা
ঈদে বাড়ি ফেরার পথে ঝুঁকি: ট্রাক-পিকআপে যাত্রা

ঈদে বাড়ি ফেরার পথে ঝুঁকি: ট্রাক-পিকআপে জীবনের বাজি রেখে যাত্রা

পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে লাখো মানুষ। যেকোনো উপায়ে ঘরে ফেরার চেষ্টা করছেন কমবেশি সবাই। এমন পরিস্থিতিতে অনেককে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। অনেকে কম ভাড়ায় ট্রাক-মোটরসাইকেল এবং ট্রেনের ছাদে উঠে বাড়ি ফিরছেন। তবে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দিয়ে বাসে বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে অনেকের। আবার বাড়তি ভাড়া দিতে না পেরে কম ভাড়ায় মালবাহী ট্রাকে বাড়ি ফিরেছেন অনেকে।

ঢাকা-যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়কের দৃশ্য

বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার ঢাকা-যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়কের সিরাজগঞ্জের কড্ডা, নলকা, ঝাঔল ওভারব্রিজ ও হাটিকমুরুল গোল চত্বরে এ দৃশ্য দেখা যায়। ঢাকা-যমুনা সেতু পশ্চিম মহাসড়ক দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক ও পিকআপে গাদাগাদি করে বসে বাড়ি যাচ্ছিলেন অনেকে। তবে তাদের সবাই জীবনের ঝুঁঁকি নিয়ে যাত্রা করেছেন। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কেউবা একে অপরকে শক্ত করে ধরে আছেন; শুধু পড়ে না যাওয়ার ভয়ে। প্রতি বছর ঈদ এলেই এভাবেই রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গ্রামে আসেন শ্রমজীবী মানুষ। এই যাত্রায় ঝুঁকি ও মনে ভয় থাকলেও বাড়ি ফেরার তাড়নায় সেটি ভুলে যান অনেকে।

যাত্রীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা

এসব যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে বাসের জন্য অপেক্ষা করেও টিকিট না পাওয়ায় আবার দ্বিগুণ-তিন গুণ ভাড়া বেশি চাওয়ায় একপ্রকার বাধ্য হয়ে ট্রাক ও পিকআপে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করেছেন। জীবনের ঝুঁকির চেয়েও পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে না পারার কষ্ট বেশি হবে বলেও জানিয়েছেন কেউ কেউ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঈদের ছুটিতে টাঙ্গাইল থেকে বগুড়ায় যাবেন সাইদুল আলম। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের রাবনা বাইপাসে প্রায় এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও কোনও বাসে উঠতে পারেননি। পরে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খোলা ট্রাকে ওঠেন। তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক সময় বাসে সাড়ে তিন থেকে চারশ টাকায় বগুড়ায় যেতাম। সেখানে ঈদ উপলক্ষে খোলা ট্রাকেই ৫০০ টাকা ভাড়া নিয়েছে। যাত্রীবাহী কোনও বাসে উঠতে পারি নাই। ভাড়া ৮০০ টাকা চাচ্ছে। আমার মতো গরিব মানুষের ঈদের সময় বাড়ি যেতে ও আসতে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়।’

ঢাকা থেকে বগুড়ায় রওনা দেওয়া পোশাককর্মী রাশেদা বেগম বলেন, ‘বাসে ৫০০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা। একটি বাসে অনেক যাত্রীও নেয়। টিকিটও পাইনি। আমার বাচ্চারা অপেক্ষা করে আছে। পরে ৩০০ টাকা দিয়ে ট্রাকে উঠেছি। কষ্ট হলেও ট্রাকেই উঠতে হয়েছে। ঝুঁকি আছে জেনেও সন্তানদের সঙ্গে ঈদ করতে যাচ্ছি।’ তার পাশে বসা ট্রাকের আরেক যাত্রী রাজমিস্ত্রি মমিন মিয়া বলেন, ‘ভাই, ভয় তো লাগে। কিন্তু বাড়িতে না গেলে মায়ের মুখটা দেখব কীভাবে? এজন্য ঝুঁকি নিয়েই যাচ্ছি। না গেলে মা মন খারাপ করবে। নিজেরও কষ্ট হবে।’

চালকদের দৃষ্টিভঙ্গি

শুধু তাদের গল্পই নয়, এই যাত্রার নীরব সাক্ষী চালকরাও। নাটোরগামী সিমেন্টবোঝাই ট্রাকচালক শুক্কুর আলী বলেন, ‘আমরা জানি এটা ঠিক না। কিন্তু মানুষ এত অনুরোধ করে যে ফিরিয়ে দিতে পারি না। কেউ কেউ বেশি ভাড়া দেয়, আবার কারও চোখের পানি দেখলেও না বলা যায় না। তবে ভয় সব সময়ই থাকে। একটু ভুল হলেই দুর্ঘটনা।’

তার কথার মাঝেই ফুটে ওঠে বাস্তবতার কঠিন দিক। আর আইন অমান্য ও ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াতের মানবিকতার টানাপোড়েন তো আছেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পিকআপের চালক জানান, সামনে ঈদ সবাই বাড়িতে যাওয়ার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কিছু বাসের শ্রমিকরা বেশি লাভের আশায় ভাড়া অতিরিক্ত নেওয়ায় মানুষগুলো ট্রাক ও পিকআপে ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে যায়। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলতে হয়। দুর্ঘটনার ভয়ও সবসময় থাকে।

সমাজকর্মী ও প্রশাসনের মতামত

নগরবাড়ীগামী ট্রাকের যাত্রী নাঈম শেখ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রিয়জনের টানে ঝুঁকির এই যাত্রা কবে শেষ হবে এই প্রশ্ন থেকেই যায়। তবে যতদিন না সবার জন্য নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা নিশ্চিত হচ্ছে, ততদিন হয়তো ট্রাকেই হবে হাজারো মানুষের ঈদযাত্রার শেষ ভরসা।’

কড্ডার মোড় এলাকায় রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী লিয়াকত হোসেন বলেন, ‘এভাবে ট্রাকে যাত্রী বহন বিপজ্জনক। অতিরিক্ত ওজন, ভারসাম্যহীনতা, হঠাৎ ব্রেক যেকোনো মুহূর্তেই ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ ঝুঁঁকির দিকেই ঝুঁঁকে পড়ে। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও ঈদের সময় সেই নিয়ম যেন কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। পরিবহন সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া আর টিকিটের অপ্রতুলতা শ্রমজীবী মানুষদের ঠেলে দেয় এই অনিরাপদ যাত্রায়।’

দি বার্ড সেফটি হাউজের চেয়ারম্যান ও সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, ‘এটা শুধু পরিবহন সংকট নয়, এটি ভালোবাসা আর বঞ্চনার গল্প। শহরে কঠোর পরিশ্রম করে জীবন কাটানও মানুষগুলো যখন বছরে একবার ঘরে ফিরতে চায়, তখন তাদের জন্য নিরাপদ পথ তৈরি করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। তবুও প্রশ্ন থেকে যায় কেন ভালোবাসার টানে ঘরে ফেরার এই যাত্রা এতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।’ মামুন বিশ্বাস আরও বলেন, ‘উত্তর মেলে না। ট্রাকের ছাদে বসে থাকা এই মানুষগুলোর চোখে ভেসে ওঠে একটাই ছবি, বাড়ির উঠোন, অপেক্ষায় থাকা প্রিয় মুখগুলো। সেই টানেই, জীবনের সব ভয়কে পেছনে ফেলে, তারা ছুটে চলে ঝুঁকির চূড়ায় দাঁড়িয়ে ভালোবাসার কাছে হার মানতে।’

পুলিশের বক্তব্য

এ বিষয়ে হাটিকুমরুল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘ট্রাকের ছাদে যাত্রী পরিবহন সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এমন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমরা প্রতিনিয়ত মহাসড়কে নজরদারি করছি। যাত্রীদের নিরাপদ যানে ভ্রমণের জন্য সচেতন করছি। কিন্তু যাত্রীদের অসচেতনতা ও পরিবহন সংকটের কারণে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনার ঝুঁঁকি এড়াতে যাত্রীদের ট্রাক বা মালবাহী যানবাহনে না ওঠার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত বাস সার্ভিস নিশ্চিত করার আহ্বান জানাই।’