ঈদযাত্রায় সদরঘাটে প্রাণের স্পন্দন, নৌপথে স্বস্তিময় ভ্রমণ
ঈদযাত্রায় সদরঘাটে প্রাণের স্পন্দন, নৌপথে স্বস্তি

ঈদযাত্রায় সদরঘাটে প্রাণের স্পন্দন, নৌপথে স্বস্তিময় ভ্রমণ

ঈদুল ফিতরের আগে রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাট নৌ টার্মিনালে ফিরেছে প্রাণের স্পন্দন। গত কয়েক বছরের নিস্তব্ধতা ভেঙে এবার ঈদযাত্রায় যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়ে সদরঘাট যেন তার পুরোনো রূপ ফিরে পেয়েছে। পদ্মা সেতু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সহজ হলেও, ঈদের সময় নৌপথ এখনও কাঙ্ক্ষিত ও স্বস্তিময় যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।

যাত্রীচাপে সদরঘাটের ব্যস্ততা

বুধবার (১৮ মার্চ) সরেজমিনে দেখা গেছে, ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস হওয়ায় সকাল থেকেই সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে চিরচেনা উপচেপড়া ভিড় ও ব্যস্ততা। দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই নৌ-বন্দরে ভোর থেকেই যাত্রীদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। প্রতিটি লঞ্চ যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে ছেড়ে যাচ্ছে, তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কঠোর নজরদারি রাখছে যেন কোনো লঞ্চ অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে না ছাড়ে।

দূরপাল্লার যাত্রীরা পরিবার নিয়ে অনেক আগেই ঘাটে পৌঁছে গেছেন। কেউ টিকিট কাটছেন, কেউ মালপত্র গুছিয়ে লঞ্চের জন্য অপেক্ষা করছেন। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে যাত্রীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষ করে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা আসন নিশ্চিত করতে ভিড় জমিয়েছেন। পাশাপাশি মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুরের মতো স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরাও নির্ধারিত লঞ্চ ধরে রওনা দিচ্ছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিআইডব্লিউটিএর বিশেষ উদ্যোগ

নৌপরিবহন ও সেতু প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান জানান, ঈদ উপলক্ষে যাত্রীচাপ সামাল দিতে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। যাত্রীদের সেবা বাড়াতে গতকাল থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১২ দিন টার্মিনাল থেকে লঞ্চ পর্যন্ত যাত্রীদের মালামাল বহনে বিনামূল্যে কুলি বা পোর্টার সেবা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ১০০টি ট্রলি বিমানবন্দর থেকে আনা হয়েছে এবং অসুস্থ, অক্ষম বা বয়স্কদের জন্য ২০টি গেট এলাকায় মোট ৪০টি হুইলচেয়ার স্থাপন করা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর বন্দর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, ঈদের আগে পাঁচ দিন এবং পরে পাঁচ দিনসহ মোট ১০ দিনের জন্য ফ্রি কুলি সেবা দেওয়া হচ্ছে, যেখানে কুলিদের বেতন কর্তৃপক্ষ নিজস্বভাবে দিচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারের ঈদে সদরঘাট হয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ মানুষ নদীপথে বাড়ি ফিরবেন।

যাত্রী ও কর্মীদের প্রতিক্রিয়া

ঘাটে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনরত ডেক ক্যাডেট মো: গিয়াস সিকদার বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএর অধীনে গত দু’দিন ধরে আমরা এখানে নিয়োজিত আছি। আমাদের টিম শিফটিং অনুযায়ী আগামী ২৯ তারিখ পর্যন্ত এখানে থাকবে। অসুস্থ ও পঙ্গু মানুষদের লঞ্চে উঠতে সাহায্য করা থেকে শুরু করে সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা কাজ করছি।’

পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটাতে বরিশাল যাচ্ছেন মুফতিজুল কবির কিরণ। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ঘাটের পরিবেশ বেশ শান্ত। ভাড়া নিয়ে কোনও বাড়তি চাপ নেই। ৪০০ টাকার টিকিট, ১০ পার্সেন্ট ছাড়ে ৩৫০ টাকায় পেয়ে বেশ ভালো লাগছে। ডেক ক্যাডেটদের সহযোগিতা সত্যি প্রশংসনীয়।’

যাত্রীর জন্য পন্টুনে দাঁড়িয়ে নৌযানের স্টাফ জাকির হোসেন মিলন বলেন, ‘আমরা সরকারি নির্দেশনা মেনে চলছি। যাত্রীদের নিরাপত্তা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। কর্তৃপক্ষ বারবার মাইকিং করে সতর্ক করছে, যেন অতিরিক্ত যাত্রী না নেওয়া হয়।’

সদরঘাটের পরিবর্তিত চিত্র

সদরঘাটের ইজারাদার মোঃ সুমন ভূইয়া বলেন, ‘গত ৫৪ বছরে সদরঘাটের এমন সুন্দর চিত্র আর কখনো দেখা যায়নি। ঈদযাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে কোন ধরনের চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেনি। যানজট তুলনামূলক কম এবং নৌপথে বাড়তি ভাড়া কিংবা পার্কিং চার্জ নিয়েও কোন অভিযোগ নেই।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রতিদিন গড়ে ৫৫ থেকে ৬০টি লঞ্চ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে এবং ইফতারের সময় বিনামূল্যে ইফতার বিতরণ করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, নদী পথের যাত্রাকে সারাদেশে যানজটমুক্ত আরামদায়ক ভ্রমণের রোল মডেল হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা চলছে, যা ঈদযাত্রীদের জন্য স্বস্তিময় অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করছে।