সাতক্ষীরার ঐতিহাসিক তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ: ১৬৭ বছরের স্থাপত্য নিদর্শন
তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ: ১৬৭ বছরের ঐতিহাসিক স্থাপনা

সাতক্ষীরার ঐতিহাসিক তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ: ১৬৭ বছরের স্থাপত্য নিদর্শন

সাতক্ষীরার তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে সবুজ গাছপালার ফাঁকে দূর থেকে চোখে পড়ে সারি সারি সাদা গম্বুজ আর উঁচু মিনার। এখানে যেন থেমে আছে সময়, আর সেই সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড় শতাব্দী পুরোনো তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ।

স্থাপত্যের ইতিহাস ও নির্মাণ

তালা উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে তেঁতুলিয়া গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন জমিদার ছালামাতুল্লাহ খান। মসজিদের গায়ে খোদাই করা ইংরেজি ও বাংলা হরফে লেখা আছে, ১৮৫৮-৫৯ সালে শেষ হয় নির্মাণকাজ। অর্থাৎ, ১৬৭ বছরের বেশি সময় ধরে এটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে।

লেখক মিজানুর রহমানের ‘সাতক্ষীরা পুরাকীর্তি’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, জমিদারি কাজের সূত্রে প্রায়ই কলকাতায় যেতেন ছালামাতুল্লাহ খান। সেখানে জাকারিয়া স্ট্রিটের পট্টি মসজিদের নান্দনিক স্থাপত্য তাঁকে মুগ্ধ করে, যা থেকে তিনি নিজের জমিদারিতে একটি অনন্য মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। পরে দিল্লি থেকে নির্মাতা এনে গড়ে তোলা হয় এই মসজিদ।

অনন্য স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য

মসজিদটিতে ছড়িয়ে আছে অনন্য স্থাপত্যকলা। চার কোনায় চারটি সুউচ্চ মিনার আকাশের দিকে প্রসারিত। ছোট–বড় মিলিয়ে মোট ২০টি মিনার পুরো স্থাপনাকে দিয়েছে রাজসিক আভা। ছাদের ওপর দুই সারিতে আছে ছয়টি বড় গম্বুজ, এর চারপাশে ছোট গম্বুজগুলো স্থাপনাটিকে অলংকারের মতো ঘিরে রেখেছে।

মসজিদটিতে আছে খিলানযুক্ত সাতটি দরজা। প্রতিটি দরজার উচ্চতা প্রায় আট ফুট এবং প্রস্থ সাড়ে চার ফুট। দরজার খিলান অর্ধগোলাকার হলেও সেগুলো বসানো হয়েছে চারকোনা ফ্রেমের ওপর। ভেতরে ঢুকলে দেখা যায়, দুটি বড় গোলাকার স্তম্ভ, যেগুলো গম্বুজের ভার বহন করছে।

স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কার

সময়ের সঙ্গে এই মসজিদকে ঘিরে নানা ইতিহাসও তৈরি হয়েছে। দেয়ালের টেরাকোটার কারুকাজে ফুটে উঠেছে লতাপাতা, চাঁদ ও তারার নকশা। বিকেলের আলো পড়লে এসব কারুকাজ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে—মসজিদটির মেঝে ও দেয়াল পালিশ করতে সুরকি–বালুর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ ডিমের সাদা অংশ মেশানো হয়েছিল। এ কারণে এত বছর পরও মেঝের মসৃণতা অনেক দর্শনার্থীর দৃষ্টি কাড়ে।

খুলনা–পাইকগাছা সড়কের পাশে অবস্থিত মসজিদটি দুটি অংশে বিভক্ত। পশ্চিম পাশে আছে ছাদযুক্ত মূল নামাজঘর, যার দৈর্ঘ্য ৪৭ ফুট ও প্রস্থ ৩০ ফুট। পূর্ব পাশে আছে ছাদবিহীন একটি চত্বর, যার দৈর্ঘ্য ৩৭ ফুট ও প্রস্থ ৩০ ফুট। বর্তমানে স্থানীয় কমিটি সেখানে টিনের ছাউনি দিয়েছে। মসজিদের ভেতরে প্রায় ১৫০ জন এবং বাইরে প্রায় ২০০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।

সংরক্ষণের উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ

১৯৮৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অর্থায়নে মসজিদ ও চত্বরের মেঝে সংস্কার করা হয়েছিল বলে জানান খতিব মো. আবদুর রব। তিনি বলেন, সেই সংস্কারের পর মেঝের অবস্থা আগের মতো নেই। স্থানীয়ভাবে মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা কাজী মহিবুল ইসলাম বলেন, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এই ঐতিহাসিক মসজিদ দেখতে আসেন। কিন্তু আগের টেরাকোটার নান্দনিক সৌন্দর্যের অনেকটাই এখন সাধারণ রঙের প্রলেপে ঢাকা পড়েছে।

মসজিদ কমিটির আহ্বায়ক কাজী শামীমুল ইসলাম বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ একসময় কিছু সংস্কার করলেও এখন আর তেমন উদ্যোগ দেখা যায় না। দ্রুত সরকারি উদ্যোগে যথাযথ সংরক্ষণ না করা হলে ঐতিহাসিক এই স্থাপনা ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।