পদ্মা সেতুর পরেও ঈদযাত্রায় লঞ্চের কেবিনে চাহিদা তুঙ্গে, তবে জ্বালানি সংকটে শঙ্কা
পদ্মা সেতুর পরেও লঞ্চের কেবিনে ঈদযাত্রীদের চাহিদা তুঙ্গে

পদ্মা সেতুর পরেও ঈদযাত্রায় লঞ্চের কেবিনে চাহিদা তুঙ্গে, জ্বালানি সংকটে শঙ্কা

২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে পদ্মা বহুমুখী সেতুর উদ্বোধনের পর ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সড়কপথে দ্রুত পৌঁছাতে পারায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ নৌপথ বিমুখ হলেও, আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে লঞ্চের কেবিন টিকিটের চাহিদা এখনও তুঙ্গে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, লঞ্চের ডেক ও ইকোনোমি শ্রেণিতে যাতায়াত কমলেও আরামদায়ক এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণের জন্য কেবিনের চাহিদা এখনও অনেক বেশি।

ঈদযাত্রায় বড় বাধা জ্বালানি সংকট

তবে, এবারের ঈদযাত্রায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট, যা নৌপথে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক রাখা নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে। শনিবার (১৪ মার্চ) সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, ঈদমুখী বাড়ি ফেরা যাত্রীর সংখ্যা এখনও তুলনামূলক কম এবং বেশিরভাগ পন্টুনেই তেমন ভিড় নেই। তবে, সামগ্রিকভাবে যাত্রী কম থাকলেও কেবিনের টিকিটের জন্য ভিড় করছেন অনেকে।

কেবিন টিকিটের জন্য যাত্রীদের ভিড়

এমভি তাসরিফ–১ ও এমভি টিপু–১৩সহ কয়েকটি লঞ্চের কেবিনের টিকিট যাত্রার অন্তত চার ঘণ্টা আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। লঞ্চ সংশ্লিষ্টরা জানান, কেবিন সুবিধা মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চ আয়ের যাত্রীদের আকর্ষণ করে। বর্তমানে একটি সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া এক হাজার ২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া দুই হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে।

ঈদ উপলক্ষে সপরিবারে ঢাকা ছাড়ছেন ভোলার বাসিন্দা কবির। তিনি বলেন, “বাচ্চাদের নিয়ে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাসের চেয়ে কেবিন অনেক বেশি আরামদায়ক।” একই কথা জানালেন বরিশালগামী যাত্রী মিসেস মনিরা। বরিশালগামী এক যাত্রী বলেন, “বাসে যাতায়াত ভালো লাগে না। ছোটবেলা থেকেই লঞ্চে যাতায়াত করে অভ্যাস। তবে, ডেকে যাওয়া একটু অস্বস্তিকর। তাই কেবিন খুঁজতেছি।”

লঞ্চ কর্মীদের বক্তব্য

এমভি টিপু–১৩ লঞ্চের কর্মী মো. শাহাদাৎ বলেন, “ডেক ও ইকোনোমি শ্রেণির যাত্রী কমলেও ঈদের আগে সাধারণত কেবিন টিকিট দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।” তিনি আরও বলেন, “ঈদের ছুটি এখনও শুরু না হওয়ায় যাত্রীসমাগম সীমিত। ২৫ রমজানের পর থেকে ভিড় বাড়তে শুরু করবে।”

এমভি তাসরিফ–১ লঞ্চের সুপারভাইজার মো. জামাল উদ্দিন বলেন, “কেবিনের অগ্রিম বুকিং ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। ডেকের জায়গা এখনও বেশ ফাঁকা থাকলেও কেবিন পাওয়া যাচ্ছে না।” ভাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, “সরকার নির্ধারিত ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানির দাম বাড়লে তখন ভাড়া বাড়তে পারে।”

জ্বালানি সংকটের প্রভাব

লঞ্চ মালিকদের দেওয়া তথ্যমতে, সদরঘাট থেকে দেশের ৩৮টি নৌপথে নিয়মিত ৮৫টির মতো লঞ্চ চলাচল করে। ঈদ উপলক্ষে লঞ্চ দ্বিগুণ করে ১৭০টি করা হয়েছে। আগামী ১৭ মার্চ থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত চলবে বিশেষ ঈদযাত্রা। তবে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় নৌপথে এর বড় প্রভাব পড়েছে।

সদরঘাট থেকে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর জন্য প্রতিদিন যেখানে আড়াই লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা রয়েছে, সেখানে পেট্রোবাংলার ডিপো থেকে বর্তমানে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটার সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।

লঞ্চ মালিক সমিতির মহাসচিবের উদ্বেগ

লঞ্চ মালিক সমিতির মহাসচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, “পদ্মা সেতু ও সড়ক যোগাযোগের উন্নতির ফলে নৌপথের যাত্রী সংখ্যা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। এর মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় ঈদযাত্রা স্বাভাবিক রাখা যাবে কি না তা নিয়ে আমরা চরম সংশয়ে আছি।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, জ্বালানি সংকটের কারণে লঞ্চগুলোর নিয়মিত চলাচল ব্যাহত হতে পারে, যা ঈদযাত্রীদের জন্য বাড়তি সমস্যা তৈরি করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে যাত্রীদের কেবিন টিকিটের চাহিদা মেটানোও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।