৮০ বছরে মোটরসাইকেলে বিশ্বভ্রমণ: স্টিভেন বার্নেটের গিনেস রেকর্ডের স্বপ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের স্টিভেন বার্নেটের জীবনে মোটরসাইকেলের প্রেম শুরু হয়েছিল মাত্র ১৫ বছর বয়সে। গত পাঁচ দশকে তিনি দুই চাকায় চড়ে বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশ পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর যাত্রাটি শুরু করেছেন ৮০ ছুঁই ছুঁই বয়সে, হৃদযন্ত্রে স্টেন্ট নিয়ে। এই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ২০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পানামায় স্থানান্তরিত হন এবং এখন মোটরসাইকেলে বিশ্বভ্রমণকারী বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি হিসেবে গিনেস রেকর্ড গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন।
রোমাঞ্চকর যাত্রার শুরু মাদ্রিদ থেকে
৭ মার্চ বার্নেট স্পেনের মাদ্রিদে পৌঁছান, যেখান থেকে তাঁর এক বছরব্যাপী দীর্ঘ যাত্রা শুরু হবে। তিনি মোট ২৭টি দেশ ভ্রমণ করবেন, যার মধ্যে ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া এবং পেরুর মতো দেশগুলো অন্তর্ভুক্ত। প্রায় ৫০ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে তাঁকে, যা একটি চ্যালেঞ্জিং অভিযান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত বছর হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর বার্নেটের হৃদযন্ত্রে স্টেন্ট বসানো হয়। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে শিখিয়েছে যে ভবিষ্যতের জন্য কোনো কাজ ফেলে রাখা উচিত নয়। বার্নেটের ভাষায়, ‘আপনার হাতে ঠিক কত দিন সময় আছে, তা আপনি জানেন না।’ এই চিন্তাধারাই তাঁকে নতুন করে জীবন উপভোগ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
ব্রিজেট ম্যাককাচেনের গল্প থেকে অনুপ্রেরণা
বার্নেট এই রোমাঞ্চকর যাত্রার জন্য সিএনএনের একটি নিবন্ধ পড়ে অনুপ্রাণিত হন, যা ব্রিজেট ম্যাককাচেনকে নিয়ে লেখা ছিল। ব্রিজেট তখন মোটরসাইকেলে একা পুরো বিশ্ব ঘোরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। নিবন্ধটি পড়ে বার্নেট তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পানামায় তাঁদের দেখা হয়। প্রায় এক বছর পর ব্রিজেট সফলভাবে তাঁর বিশ্বভ্রমণ শেষ করেন।
বার্নেট বলেন, ‘আমি বললাম, দাঁড়াও! সে যদি মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সে এটা করতে পারে, তবে আমি পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বয়সে কেন পারব না?’ তিনি স্বীকার করেন যে ব্রিজেটের গল্পটি না জানা পর্যন্ত এমন চিন্তা তাঁর মাথায় আসেনি। এরপর তিনি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং জানতে পারেন যে মোটরসাইকেলে বিশ্বভ্রমণ করা সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তির কোনো রেকর্ড আগে হয়নি।
প্রস্তুতি এবং চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘ দূরত্বের মোটরসাইকেল যাত্রায় বার্নেট আগে থেকেই অভিজ্ঞ। গত অক্টোবরে তিনি একটি নতুন সুজুকি ডিআর–৬৫০ মোটরসাইকেল কেনেন এবং কয়েক মাস ধরে এটি ভ্রমণের উপযোগী করে সাজিয়েছেন। তিনি গাড়ির তেলের ট্যাংকটি বড় করেছেন এবং সাসপেনশন আরও শক্তিশালী করেছেন। সর্বশেষ হৃদযন্ত্রের পরীক্ষাসহ যাবতীয় শারীরিক পরীক্ষা–নিরীক্ষায় তিনি সুস্থ প্রমাণিত হয়েছেন।
গিনেস রেকর্ডের শর্ত অনুযায়ী পুরোটা পথ তাঁকে একই মোটরসাইকেলে পাড়ি দিতে হবে। তবে বয়স বিবেচনায় তিনি দুর্গম রাস্তার বদলে তুলনামূলক ব্যস্ত রাস্তাগুলো বেছে নেবেন, কারণ আগের মতো ভারী বাইক টেনে তোলার শক্তি এখন তাঁর নেই। থাকার জন্য তিনি হোটেল বা হোস্টেল ব্যবহার করবেন, কারণ মাটিতে ঘুমাতে তিনি পছন্দ করেন না। যাত্রাপথে নিজের সঙ্গী হিসেবে তিনি সঙ্গে নিচ্ছেন ‘রকি’ নামের একটি খেলনা র্যাকুন এবং একটি ম্যান্ডোলিন।
সামাজিক প্রভাব এবং অনুপ্রেরণা
বার্নেট বলেন, এই ভ্রমণ রোলার কোস্টারে চড়ার মতো। মাঝেমধ্যে মনে হবে এটি পৃথিবীর সেরা কাজ, আবার কখনো মনে হবে, ‘আমি এখানে কী করছি!’ তবু নতুন মানুষের সঙ্গে মেশার আনন্দে তিনি রোমাঞ্চিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর এই উদ্যোগ ইতিমধ্যে সাড়া ফেলেছে এবং অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস তাঁর আবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে, এবং বার্নেট বিশ্বাস করেন যে তাঁর বর্তমান ৭৮–৭৯ বছর বয়স এই রেকর্ড গড়ার জন্য যথেষ্ট। এই যাত্রা শুধু একটি ব্যক্তিগত লক্ষ্যই নয়, বরং বয়সের সীমাকে অতিক্রম করে জীবনকে উপভোগ করার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
