হাইওয়ের সাইনবোর্ড সবুজ রঙের হয় কেন? বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক কারণ জানুন
ঢাকা-চট্টগ্রাম বা ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ভ্রমণের সময় রাস্তার পাশে বড় বড় সবুজ রঙের সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। এই বোর্ডগুলোতে সাদা অক্ষরে বিভিন্ন স্থানের নাম বা দূরত্বের তথ্য লেখা থাকে, যাকে 'গাইড সাইন' বলা হয়। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই বোর্ডগুলো অন্য কোনো রঙের না হয়ে কেন সব সময় সবুজই হয়? কেন এগুলো বেগুনি বা গাঢ় গোলাপি রঙের হলো না? এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
সবুজ রং চোখের জন্য আরামদায়ক
প্রথমত, সবুজ রংটি আমাদের চোখের জন্য খুবই আরামদায়ক। যখন একজন চালক দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান, তখন লাল বা হলুদের মতো কড়া রং চোখের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে, সবুজ রং খুব দূর থেকেও পরিষ্কার দেখা যায় এবং এটি চালকের মনোযোগ নষ্ট করে না। এ ছাড়া রাতের অন্ধকারে যখন গাড়ির হেডলাইটের আলো এই সবুজ বোর্ডে পড়ে, তখন এর প্রতিফলন চালককে বিভ্রান্ত করে না, বরং লেখাগুলো পড়তে সাহায্য করে। পুরো বিশ্বের মতো বাংলাদেশের হাইওয়েতেও এই একই নিয়ম মেনে চলা হয়।
তিনটি প্রধান বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক কারণ
ট্রাফিক লাইটে সবুজ মানেই 'এগিয়ে যান'। কিন্তু হাইওয়ের বিশাল বোর্ডগুলো কেন সব সময় সবুজ হয়, এর পেছনে তিনটি প্রধান বৈজ্ঞানিক ও ব্যবহারিক কারণ রয়েছে।
- খুব সহজে চোখে পড়ে: হাইওয়ের সাইনবোর্ড এমন হওয়া উচিত, যা দূর থেকে অনায়াসেই পড়া যায়। ১৯৫০ সালে শত শত চালকের ওপর একটি পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, প্রায় ৫৮ শতাংশ চালকই মনে করেন সবুজ বোর্ডের ওপর সাদা রঙের লেখা সবচেয়ে পরিষ্কার দেখা যায়। মূলত আমাদের চোখের ভেতরে রড ও কোন নামের বিশেষ কোষ থাকে, যা আলো শনাক্ত করে। সবুজ রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য থাকে নীল ও লালের ঠিক মাঝামাঝি। এই নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো আমাদের চোখ সবচেয়ে সহজে ধরতে পারে। এ ছাড়া এই বোর্ডগুলো বেশ বড় হয় এবং এতে বিশেষ একধরনের প্রতিফলক আবরণ থাকে। ফলে রাতে বা কুয়াশার মধ্যেও গাড়ির আলো পড়লে লেখাগুলো জ্বলজ্বল করে ওঠে।
- টেকসই ও সহজে রং চটে না: রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তার ধারের সাইনবোর্ডগুলোর রং দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ রং অন্য অনেক রঙের চেয়ে বেশি দিন টেকে। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, একটি লাল সাইনবোর্ড মাত্র ১২ বছর টেকে, যেখানে সবুজ সাইনবোর্ড অনায়াসেই ৪২ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। যদিও নতুন প্রযুক্তিতে এখন সব রঙের স্থায়িত্ব বাড়ছে, তবু ঐতিহাসিকভাবে সবুজ রং রোদে কম বিবর্ণ হয়।
- মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় না: সবুজকে বলা হয় শীতল রং। এটি রাস্তার ধারের গাছপালা বা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকে, তাই চালক হুট করে ভয় পান না বা তার মনোযোগ নষ্ট হয় না। অন্যদিকে লাল, হলুদ বা কমলা রংগুলো খুব উজ্জ্বল হওয়ায় তা চালককে সতর্ক করতে ব্যবহার করা হয়। সামনে রাস্তা খারাপ থাকলে হলুদ বা থামার জন্য লাল রং ব্যবহার করা হয়। মজার বিষয় হলো, সবুজ রং মানুষের মনের ওপর শান্ত প্রভাব ফেলে। এটি উদ্বেগ কমায় ও হৃৎস্পন্দন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। হাইওয়েতে গাড়ি চালানোর সময় চালক যেন দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে পারেন, সে জন্যই এই আরামদায়ক রঙের বোর্ড ব্যবহার করা হয়।
ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক নিয়ম
তবে আজ আমরা রাস্তায় সব জায়গায় একই ধরনের সাইনবোর্ড দেখি, একসময় কিন্তু পরিস্থিতি এমন ছিল না। ১৯০০ সালের শুরুতে আমেরিকায় যখন প্রথম ট্রাফিক চিহ্ন চালু হয়, তখন এর কোনো নির্দিষ্ট রং বা আকার ছিল না। একেক শহর বা এলাকা তাদের ইচ্ছামতো রং ব্যবহার করত। এতে চালকেরা মহাবিপদে পড়তেন। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গেলে কোন চিহ্নের কী অর্থ, তা বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়ত। এমনকি একটি রাস্তার জন্যই ১১ ধরনের আলাদা চিহ্ন ব্যবহারের নজিরও ছিল।
এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে ১৯২৭ সালে প্রথম সব নিয়ম এক করার চিন্তা শুরু হয়। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয় একটি বিশেষ নির্দেশিকা, যেখানে কোন চিহ্ন কেমন হবে তার একটি প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়। তবে তখনো সবুজ রংটি বাধ্যতামূলক ছিল না। আসল পরিবর্তন আসে ১৯৫০ সালে, যখন বড় বড় মহাসড়ক বা এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি শুরু হয়। তখন প্রকৌশলীরা বুঝতে পারেন, দ্রুতগতির চালকদের জন্য দূর থেকে সহজে পড়া যায় এমন একটি অভিন্ন ব্যবস্থা দরকার। অবশেষে ১৯৬১ সালে নিয়ম করা হয়, মহাসড়কের নির্দেশক বোর্ডগুলো হবে সবুজ রঙের আর তার ওপর লেখা থাকবে সাদা অক্ষরে। সেই নিয়মই আজ সারা বিশ্বে জনপ্রিয়।
১৯৬৮ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে ভিয়েনা কনভেনশন নামে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল সারা বিশ্বের রাস্তার সংকেতগুলোকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে আনা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করায় ওই সব অঞ্চলে এখন প্রায় একই ধরনের ট্রাফিক চিহ্ন দেখা যায়। ফলে এক দেশের চালক অন্য দেশে গিয়েও খুব সহজে রাস্তার ভাষা বুঝতে পারেন।



