কাপ্তাই লেকে কায়াকিং: ভ্রমণসঙ্গী কম হলেও রোমাঞ্চের কমতি নেই
কাপ্তাই লেকে কায়াকিং: ভ্রমণসঙ্গী কম হলেও রোমাঞ্চের কমতি নেই

কাপ্তাই লেকে কায়াকিং: ভ্রমণসঙ্গী কম হলেও রোমাঞ্চের কমতি নেই

গত ঈদের ছুটিতে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা জাগলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সময়ের অভাব প্রকট হয়ে উঠল। জীবনের এই চিরন্তন সত্যটি আবারও মনে করিয়ে দিল। বেশ কয়েকজনের কাছে আবদার জানালেও কারও সময় মিলল না, কারও মিললেও সুযোগ হলো না। অফিস থেকে বাড়তি ছুটি নিয়েও শেষ পর্যন্ত বাসায় বসেই কাটিয়ে দিতে হলো। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে একদিন ঠিক করলাম, ঘুরতেই যাব। সবার সুবিধার কথা ভেবে জায়গা বেছে নিলাম কাপ্তাই।

পরিকল্পনা থেকে বাস্তবতা: ১০ জন থেকে ৪ জন

প্রাথমিকভাবে ১০ জনের একটি দল গঠিত হলেও যাত্রার মুহূর্তে সংখ্যা কমে ঠেকল মাত্র চারজনে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হতে হলো। তবে ভ্রমণ শেষে মনে হলো, এই ট্রিপটা আসলেই দরকার ছিল। কাপ্তাই আবারও প্রমাণ করল, ভ্রমণসঙ্গী যতজনই হোক না কেন, রোমাঞ্চ আর প্রশান্তির কোনো কমতি নেই সেখানে।

প্যানারোমা ঝুম রিসোর্টে পরিবর্তনের ছোঁয়া

চট্টগ্রাম পুরো বাংলাদেশের মধ্যেই এক টুকরো স্বর্গ; যেখানে সমুদ্র, পাহাড়, নদী, ঝরনা—সবই মিলেমিশে আছে। কাপ্তাই আগেও গিয়েছি বহুবার, তবু প্রতিবারই যেন নিজেকে নতুন করে চেনায় জায়গাটি। বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে বাসে চড়ে পৌঁছালাম কাপ্তাই লিচুবাগানে। সেখান থেকে পুরো দিনের ঘোরাঘুরির জন্য সিএনজি বেছে নিলাম।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সিএনজিতে চড়ে পৌঁছালাম প্যানারোমা ঝুম রিসোর্টে। টিকিটের দাম এখন ৪০ টাকা। শেষবার যখন গিয়েছিলাম, তার সঙ্গে বেশ অনেকখানি পার্থক্যই চোখে পড়ল। ঝুম রেস্তোরাঁ এখন পুরোদস্তুর বনে গেছে ঝুম রিসোর্টে। নতুন রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, আশপাশে অনেক নতুন স্পট সংযোজন হয়েছে—চেকমেট কর্নার, লাভ পয়েন্ট, কিডস জোনসহ আরও অনেক কিছু। কায়াকিং জোনটা এখনো আগের মতোই আছে, তবে মানুষজন এখন লেকের খুব কাছে নেমে ছবি তুলতে পারে, যা আগে সম্ভব ছিল না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বেরাইণ্য ক্যাফেতে সময় কাটানো

জুম থেকে বেরিয়ে রওনা দিলাম বেরাইণ্যের উদ্দেশে। পথে দেখলাম একসময়ের জনপ্রিয় প্রশান্তি পার্কটি দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে এখন নতুন নতুন সব রিসোর্ট মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ঘণ্টাখানেকের যাত্রাপথে বিরতি নিলাম একটি জুমঘরে। পাহাড়ের কিনারায় বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর সঙ্গে মসলা মাখানো টাটকা পাহাড়ি আনারসের স্বাদ এখনো জিবে লেগে আছে। পাহাড় আর লেকের অসীম সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, সময়টা যদি এখানেই থমকে যেত।

আসাম বস্তি রোডের আঁকাবাঁকা পথ ধরে যখন বেরাইণ্যে ক্যাফেতে পৌঁছালাম, তখন দুপুরের রোদে লেকের জল চিকচিক করছিল। সেখানেও বেশ অনেক পরিবর্তন দেখলাম। নতুন করে অনেকগুলো বসার জায়গা, জুমঘর, হ্যামকের সংযোজন হয়েছে। সব মিলিয়ে বেশ সাজানো পরিবেশ। এবার যদিও বেরাইণ্যেকে খানিকটা জনবহুল মনে হলো, হয়তো লাঞ্চের সময় তাই। থাকার জন্য রিসোর্ট সুবিধাও আছে, যে কেউ চাইলে রাত্রি যাপন করতে পারবে লেকের পাশে।

খাবার ও হ্যামকের আনন্দ

আমরা অর্ডার দিয়ে আড্ডায় মেতে উঠলাম। ঘণ্টা দেড়েকের সেই আড্ডায় উঠে এল আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের না-বলা কত গল্প। চিপস খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছি, কিন্তু ক্ষুধার তাড়না যেন মিটছিল না। বারবার খাবারের খোঁজ নিচ্ছিলাম। নির্ধারিত সময়ের আরও ৩০ মিনিট পর অবশেষে যখন খাবার সামনে এল, সব অপেক্ষার অবসান হলো। খাবারের মেন্যুতে ছিল গরম ভাত ও ডাল, আলুভর্তা, কলাপাতার ভাপে তৈরি ডিম, চাপিলা মাছের চচ্চড়ি আর বিখ্যাত ব্যাম্বো চিকেন। বরাবরের মতোই এবারও বেরাইণ্যের খাবার আমাকে নিরাশ করেনি।

বেরাইণ্যেতে ঢোকার শুরু থেকেই নজর ছিল হ্যামকের দিকে। যতবারই চোখ গেল খালি আর হয় না। খাওয়াদাওয়া সেরে যখন নীরবে লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম, তখন অবশেষে জায়গা পাওয়া গেল। দৌড়ে দখলে নিলাম। বাকিরা যখন ছবি তোলায় ব্যস্ত, আমি তখন হ্যামকে বেরাইণ্যের নীরব শান্ত পরিবেশ উপভোগ করছিলাম। এই নীরবতাই হয়তো বেরাইণ্যেকে অন্য স্পটগুলোর থেকে আলাদা করে তোলে। দুলতে দুলতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, টেরই পাইনি। হয়তো কিছুক্ষণ ঘুমিয়েও পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙার পর দেখি বাকিরা তখনো দিব্যি ছবি তুলছে।

কায়াকিং ও ফেরার পথে রোমাঞ্চ

কাপ্তাই গিয়ে কায়াকিং করব না, তা কি হয়? ছবি তোলার পর্ব শেষ হলে নামলাম কায়াকিংয়ে। সময় কম থাকলেও বিশাল জলরাশিতে বইঠা হাতে নেমে পড়লাম। জলের ওপর দিয়ে ভেসে চলার সেই অনুভূতি সব সময় অন্য রকম আনন্দ দেয়। সূর্য যখন পাহাড়ের আড়ালে মুখ লুকাল, আমাদের ফেরার সময় হয়ে এল।

ফেরার পথে আলো নিভে আসছিল, পাহাড়ি রাস্তায় নামছিল সন্ধ্যার ছায়া। সিএনজিচালক হঠাৎ সতর্ক করলেন—এই পথে হাতির দেখা মিলতে পারে। মাসখানেক আগেও নাকি দুজনকে হাতি মেরে ফেলেছে এখানে। রোমাঞ্চ আর ভয় একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করল মনে। অন্ধকার পাহাড়ি পথে প্রতিটি বাঁকে এক অজানা শিহরণ। শেষ পর্যন্ত হাতির মুখোমুখি হতে হয়নি—নিরাপদেই ফিরে এলাম লিচুবাগানে।

শেষ কথা: ভ্রমণের মূল্যায়ন

বাসের টিকিট কেটে সবাই একসঙ্গে শেষবারের মতো চা খেলাম। শহরে ফেরার বাসে যখন বসলাম, তখন সারা গায়ে ভ্রমণের ক্লান্তি থাকলেও মনটা ছিল একদম ফুরফুরে। ১০ জনের পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ৪ জনে এসে ঠেকেছিল—কিন্তু ভ্রমণটা মোটেও ছোট হয়নি। বরং তিনজনের সঙ্গে দিনটি ছিল আনন্দময় আর অদ্ভুত রকম প্রশান্তির। জীবন হয়তো এমনই—সব পরিকল্পনা মনমতো হয় না। কাপ্তাইয়ের সেই শান্ত জল আর পাহাড়ের নীরবতা এখনো চোখের সামনে ভাসছে।