মাছাপুচ্ছ্রে রহস্যময় নিখোঁজ: অভিযাত্রী তিলক লিম্বু ও শৈলজিতের দল অদৃশ্য
ভোরের সোনালি আলো মাছাপুচ্ছ্রের বরফঢাকা শৃঙ্গগুলোকে ঝলমল করে তুললেও অভিযাত্রী দলের জন্য সেটা ছিল উদ্বেগের শুরু। ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত চেপে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তারা আবিষ্কার করল, তিলক লিম্বু উপস্থিত নেই। গতকাল বিকেল পর্যন্ত তিনি লাকপা শেরপার সঙ্গে একই তাঁবুতে ছিলেন, কিন্তু রাতের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছেন। চারপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু হলো, কিন্তু বরফের ওপর কোনো পায়ের ছাপ বা সূত্র পাওয়া যায়নি।
দলের মধ্যে বিভক্তি ও সিদ্ধান্তহীনতা
শেরপারা প্রথমে ভেবেছিল তিলক হয়তো আশেপাশে রেকি করছে, কিন্তু সময় গড়াতেই উৎকণ্ঠা বাড়তে লাগল। শৈলজিত রায় দাবি করলেন, "তিলক পালিয়েছে আমি শিওর। গতকাল থেকেই তার আচরণে সন্দেহ হচ্ছিল।" দলনেতা ইখতিয়ার হামিম সামিট জয়ের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিলে শেরপারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। সোনাম শেরপা জোর দিয়ে বললেন, "সামিট পরে হবে। আগে তিলক দাইকে খুঁজে বের করতে হবে।" শেষ পর্যন্ত ইখতিয়ার অনুশোচনা প্রকাশ করে তিলককে খোঁজার সিদ্ধান্ত নিলেন।
চার দলে বিভক্ত হয়ে খোঁজাখুঁজি
পবন থাপার প্রস্তাবে আটজনকে চার দলে ভাগ করা হলো। প্রতিটি দলে একজন শেরপা ও একজন অভিযাত্রী থাকবে বলে ঠিক হলো। ইখতিয়ার ও সোনাম উত্তর দিকে, শৈলজিত ও লাকপা দক্ষিণ দিকে, পবন ও পাসাং পূর্ব দিকে এবং রিনজো খড়কা ও পেম্বা পশ্চিম দিকে রওনা দিলেন। নিয়ম ছিল সূর্যাস্তের আগে ফিরে আসার, কিন্তু শৈলজিত-লাকপার দল ফেরেনি। সারাদিন খোঁজাখুঁজির পরও তিলকের কোনো সন্ধান মেলেনি।
অন্ধকারে রহস্যময় ঘটনা
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে অন্ধকারে মাছাপুচ্ছ্র ডুবে গেল। শৈলজিতের দলের অপেক্ষায় থাকা দলটি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও তাদের দেখা না পেয়ে সবাই নিশ্চিত হলো বিপদেই পড়েছেন তারা। ইখতিয়ারের নেতৃত্বে দলের মনোবল ভেঙে পড়তে লাগল। পেম্বা শেরপা সরাসরি ইখতিয়ারকে দায়ী করে বললেন, "তিলক দাইয়ের সতর্কবার্তা তুমি মানোনি। সব দায়ভার তোমাকেই নিতে হবে।"
রাতের অজানা শব্দ ও আলোকরশ্মি
রাত গভীর হতে থাকলে তাঁবুর বাইরে থেকে ভারী পায়ের শব্দের মতো আওয়াজ ভেসে এলো। সোনাম শেরপা বাইরে গিয়ে কিছুই দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরলেন। রিনজো খড়কা মন্তব্য করলেন, "শব্দটা পর্বতের বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে।" পরে পবন থাপা দূর থেকে এক আলোকরশ্মি দেখতে পেয়ে দলকে সতর্ক করলেন। আলোটা টর্চ লাইটের মতো জ্বলছে-নিভছে, কিন্তু শৈলজিতের সঙ্গে টর্চ না থাকায় সেটা রহস্যময় মনে হলো।
অভিযানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ইখতিয়ার হামিম এখন বুঝতে পারছেন, তার সিদ্ধান্তগুলো ভুল ছিল। তিলক লিম্বু, শৈলজিত রায় ও লাকপা শেরপা—একে একে তিনজন নিখোঁজ হওয়ায় দলটি রহস্যের ঘেরাটোপে পড়েছে। তিনি স্বীকার করলেন, সামিটের পথে আর এগোনো সম্ভব নয়। এখন একমাত্র লক্ষ্য নিখোঁজ সঙ্গীদের খুঁজে বের করা এবং দ্রুত নিচে নামা। মাছাপুচ্ছ্রের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা অজানা রহস্য ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে, আর অভিযাত্রীদের মনে শুধু প্রশ্ন—এই পর্বত তাদের কী বার্তা দিতে চায়?



