জান্নাতে কি ঘুমের প্রয়োজন হবে? কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ
জান্নাতে কি ঘুমের প্রয়োজন? কোরআন-হাদিসের আলোকে বিশ্লেষণ

পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই যে ঘুম ছাড়া স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। কিন্তু মুমিনদের চিরকাঙ্ক্ষিত আবাস জান্নাতে কি ঘুমের প্রয়োজন হবে? জান্নাতবাসীরা কি পৃথিবীর মতো রাত-দিনের পালাবদলে ঘুমাবে? এ বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যার আলোকে আলেমরা বলেছেন যে জান্নাতের জীবন হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। সেখানে মানুষের কোনো দুর্বলতা, অপূর্ণতা, ক্লান্তি বা অবসাদ থাকবে না। বরং তা হবে অবিরাম সুখ, শান্তি, তৃপ্তি ও উপভোগের জীবন।

ঘুমের প্রকৃতি ও প্রয়োজনীয়তা

কোরআন ঘুমকে আল্লাহর বিশেষ একটি নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের নিদ্রাকে আমি করেছি বিশ্রামের মাধ্যম।’ (সুরা নাবা, আয়াত: ৯) অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘আর তিনিই তোমাদের জন্য রাতকে করেছেন আবরণস্বরূপ, ঘুমকে করেছেন বিশ্রামের মাধ্যম এবং দিনকে করেছেন (কর্মে ও জীবনে) জেগে ওঠার সময়।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৪৭) ঘুম হলো মৃত্যুর সহোদর। আর জান্নাতবাসীরা কখনো মৃত্যুবরণ করবে না। (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৪৪১৬)

আল্লাহ-তাআলা ঘুমকে মানুষের জন্য এমন এক নিয়ামত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, যা কর্মব্যস্ততার ধারাবাহিকতায় সাময়িক বিরতি এনে দেহ-মনকে পুনরুজ্জীবিত করে। দিনের বেলা জীবিকা অর্জন ও নানাবিধ কাজে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও ইন্দ্রিয়গুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে। রাতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের কর্মচাঞ্চল্য স্তিমিত হয়ে যায় এবং মানুষ বিশ্রামের সুযোগ পায়। তখন আল্লাহর দেওয়া ঘুম শরীর ও আত্মা উভয়ের ক্লান্তি দূর করে নতুন শক্তি ও সতেজতা ফিরিয়ে আনে। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ৪/৫৩৭, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জান্নাতের ঘুম: কোরআন কী বলে

পারকালের জীবন দুনিয়ার মতো নয়। জান্নাতবাসীদের দেহ হবে চিরসুস্থ ও চিরতরুণ। সেখানে বার্ধক্য, অসুস্থতা, দুর্বলতা, ক্লান্তি, বিষণ্নতা ও কোনো ধরনের অপূর্ণতা থাকবে না। ফলে জান্নাতি মানুষের অস্তিত্বই হবে ভিন্ন এক প্রকৃতির, যা পার্থিব সব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। আল্লাহ বলেন, ‘সেখানে তাদের কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং সেখান থেকে তারা বহিষ্কৃতও হবে না।’ (সুরা হিজর, আয়াত: ৪৮)

ঘুম সাধারণত ক্লান্তি দূর করার জন্য মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজন। কাজের পর মানুষের শরীর-মন অবসন্ন হয়ে পড়ে, ফলে বিশ্রামের জন্য ঘুম অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু জান্নাতের জীবন হবে এমন, যেখানে ক্লান্তির কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। অতএব, যে জগতে ক্লান্তি নেই, সেখানে ক্লান্তি দূর করার জন্য ঘুমের প্রয়োজনীয়তাও থাকে না।

জান্নাতি জীবনের আলোচনা

ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, জান্নাতবাসীদের দেহে যেমন ক্লান্তি ভর করবে না, তাদের অন্তরেও বিষণ্নতা বা বিরক্তির অনুভূতি জাগবে না। তারা সর্বদা পরিপূর্ণ প্রশান্তির মধ্যে অবস্থান করবে। কারণ, দুনিয়ার জীবনে তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত-বন্দেগিতে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিল, কষ্ট ও পরিশ্রম সহ্য করেছিল। কিন্তু জান্নাতে প্রবেশের পর তাদের ওপর থেকে সব ইবাদতের দায়িত্ব ও শরিয়তের বিধিবদ্ধ আমল উঠে যাবে। তখন তাদের জীবন হবে কেবল অফুরন্ত নিয়ামত উপভোগের জীবন। সেখানে তারা চিরকাল নিরবচ্ছিন্ন প্রশান্তি ও পরম বিশ্রামের মাঝে অবস্থান করবে। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ৫/২৬২, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)

ইমাম তাবারি (রহ.) বলেন, আল্লাহ যাদের জান্নাতের মহাসম্মানে ভূষিত করবেন, তারা জান্নাতে প্রবেশ করে কৃতজ্ঞচিত্তে বলবে, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের সব দুঃখ-দুর্দশা দূর করে দিয়েছেন।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ৩৪) এখানে আল্লাহ কোনো নির্দিষ্ট দুঃখের কথা উল্লেখ করেননি। কারণ, জাহান্নামের ভয় যেমন দুঃখ, মৃত্যুর আশঙ্কাও একধরনের দুঃখ; জীবিকার চিন্তা, খাদ্যের প্রয়োজন এবং নানা ধরনের দুশ্চিন্তাও দুঃখের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে মানুষ যেসব কষ্ট ও বেদনা বয়ে বেড়ায়, জান্নাতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সেসবের সম্পূর্ণ অবসান ঘটবে। (তাফসিরে তাবারি, ২২/৪৩৪, দার ইবনুল জাওজি, কায়রো, ২০০৯)

হাদিস কী বলছে

জান্নাতে ঘুম না থাকার বিষয়ে একটি প্রসিদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এক সাহাবি নবীজির কাছে জানতে চাইলেন, ‘আল্লাহর রাসুল, জান্নাতের অধিবাসীরা কি ঘুমাবে?’ তিনি বললেন, ‘ঘুম হলো মৃত্যুর সহোদর। আর জান্নাতবাসীরা কখনো মৃত্যুবরণ করবে না।’ (বাইহাকি, শুআবুল ইমান, হাদিস: ৪৪১৬)

ঘুম মানুষের কর্মচাঞ্চল্যে সাময়িক বিরতি সৃষ্টি করে, যা মৃত্যুর সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ। এ সময় মানুষের অনুভূতি ও কর্মক্ষমতা সাময়িকভাবে স্থগিত থাকে। কিন্তু জান্নাতের জীবন হবে পূর্ণ জাগরণ ও চেতনার। সেখানে কোনো নিষ্ক্রিয়তা বা অচেতনতার প্রয়োজন নেই। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমাকে আদেশ করা হয়েছে, আমি যেন খাদিজাকে এ সুসংবাদ দিই যে জান্নাতে তাঁর জন্য মুক্তা দিয়ে নির্মিত একটি অপূর্ব প্রাসাদ রয়েছে, সেখানে কোনো হইচই থাকবে না, থাকবে না সামান্যতম ক্লান্তি বা অবসাদ।’ (সহিহুল জামে, হাদিস: ১৩৬৮)

মোট কথা, জান্নাত এমন এক আবাস, যেখানে মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহ ও অফুরন্ত নেয়ামতের মাঝে পরম সুখে অবস্থান করবে। সেখানে ঘুমের কোনো প্রয়োজনই অনুভব হবে না।

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা