দুজন মানুষের কথা ভাবুন। একজনের হাতে অর্থ আছে, প্রতিপত্তি আছে, তবু মনে এক চিরস্থায়ী অতৃপ্তি, আরও চাই, আরও চাই। আরেকজনের হাতে নেই বললেই চলে, তবু তার মুখে একটা প্রশান্তি, যা দেখলে মনে হয়, তার কোনো অভাবই নেই। এই দুই মানুষের মধ্যে আসল পার্থক্যটা সম্পদের পরিমাণে নয়, পার্থক্যটা অন্তরে।
সম্পদের পেছনে অন্ধ দৌড়ের পরিণতি
আমরা সাধারণত ঐশ্বর্য মানে বুঝি টাকাপয়সা, জমিজিরাত। আর এই ধনসম্পদের পেছনে ছুটতে গিয়ে অনেক সময় হালাল-হারামের সীমাও ভুলে যাই। এই অন্ধ দৌড়ের পরিণতি ভালো হয় না। এতে একদিকে ব্যক্তিচরিত্রে লোভ আর হিংসা বাসা বাঁধে, অন্যদিকে পরিবার-প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কে চিড় ধরে। আর শেষ পর্যন্ত যে সম্পদের জন্য এত হাহাকার, তা তো কিছু ইট-কাঠ আর কাগজের দলিলেই বন্দী থেকে যায়।
নবীজির (সা.) বাণী: প্রকৃত ঐশ্বর্য কী
নবীজি (সা.) এই সত্যই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, ‘বৈষয়িক প্রাচুর্য ঐশ্বর্য নয়, বরং প্রকৃত ঐশ্বর্য হলো অন্তরের সচ্ছলতা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৪৬) অর্থাৎ যার অন্তরে তৃপ্তি নেই, কোটি টাকার মালিক হয়েও সে দরিদ্র। আর যার অন্তরে তৃপ্তি আছে, হাতে কিছু না থাকলেও সে-ই আসল ধনী।
নবীযুগের একটি শিক্ষণীয় ঘটনা
সাহাবি আবু জরের একটি ঘটনা। নবীজি (সা.) তাঁকে একদিন জিজ্ঞেস করলেন, সম্পদ বেশি হওয়াটাই কি ঐশ্বর্য, আর কম হওয়াটাই কি দারিদ্র্য? আবু জর সরল স্বীকারোক্তিতে বললেন, হ্যাঁ। নবীজি তখন শুধরে দিলেন, ‘অন্তরের অভাবমুক্তিই প্রকৃত ঐশ্বর্য, আর মনের দারিদ্র্যই প্রকৃত দারিদ্র্য।’
এরপর তিনি দুজন মানুষের কথা তুললেন, একজন কোরাইশের প্রভাবশালী, ধনী ব্যক্তি, যাকে সবাই খুশি মনে গ্রহণ করে। আরেকজন ‘সুফফা’র (মসজিদে নববির একটি চবুতরা) এক অপরিচিত, দরিদ্র মানুষ, যাকে আবু জর চিনতেনই না। নবীজি বললেন, ‘এই দরিদ্র মানুষটি সেই ধনী লোকের চেয়ে উত্তম—পৃথিবীর সব মানুষের চেয়েও।’
আবু জর অবাক হয়ে বললেন, ‘কিন্তু ধনী লোকটিকে তো অনেক কিছু দেওয়া হয়েছে, আর এই মানুষকে কিছুই দেওয়া হয়নি!’ নবীজি জবাব দিলেন, ‘যদি তাকে ধনসম্পদ দেওয়া হয়, সে তার যোগ্য; আর যদি না দেওয়া হয়, তাকে তার চেয়ে বড় কিছু দেওয়া হয়েছে।’ (নাসায়ি, আস-সুনানুল কুবরা, হাদিস ১১৭৮৫)
এই হাদিসে একটি ভুল ধারণা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এখানে সম্পদকে খারাপ বলা হয়নি, ধনী মানুষটাকেও দোষ দেওয়া হয়নি। বরং বলা হয়েছে, সম্পদ থাকা বা না-থাকা—দুটোই আল্লাহর পরীক্ষা, আর আসল মাপকাঠি হলো মানুষটার অন্তরে কী আছে।
ইসলামে সম্পদ অর্জনের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম সম্পদ অর্জনকে নিরুৎসাহিত করে না। সাহাবিদের মধ্যে ওসমান ইবনে আফফান বা আবদুর রহমান ইবনে আওফের মতো অনেকেই বিপুল সম্পদের মালিক ছিলেন, আর তাঁদের দানশীলতার জন্য প্রশংসিতও হয়েছেন। পার্থক্যটা হলো, তাঁরা সম্পদের মালিক হলেও সম্পদ তাঁদের মালিক হয়ে উঠতে পারেনি।
অন্তরের সচ্ছলতা অর্জনের পথ
এই সচ্ছলতা কীভাবে আসে? তাহলে প্রশ্ন হলো, অন্তরের এই সচ্ছলতা কীভাবে পাওয়া যায়? এর পথটা আসলে একটাই—আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমার জন্য যা বণ্টন করেছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকো। তাহলে তুমিই হবে মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ঐশ্বর্যশালী।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২৩০৫)
এই সন্তুষ্টি মানে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। এটা মানে হলো, যা প্রাপ্তির জন্য চেষ্টা করার, তা করা, কিন্তু ফলাফল নিয়ে অন্তরে অস্থিরতা না রাখা। কারও বাড়ি, বেতন বা সাফল্য দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে না করা। কোনো একটা চেষ্টা ব্যর্থ হলে নিজেকে দেউলিয়া মনে না করা। কারণ, আল্লাহর কাছে যা আছে, তা-ই আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো।
ছোট ছোট অভ্যাসেই এই সন্তুষ্টি গড়ে ওঠে। নিজের চেয়ে কম যাদের আছে, তাদের দিকে তাকিয়ে শুকরিয়া আদায় করা, যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ থাকা, আর তুলনার অভ্যাস থেকে নিজেকে সচেতনভাবে দূরে রাখা। আল্লাহ–তাআলাই প্রকৃত দাতা, তিনি যাকে যা দিতে চান, কেউ তা রুখতে পারে না, আর তিনি দিতে না চাইলে কারও ক্ষমতা থাকে না কিছু করার। এই বিশ্বাসটা অন্তরে গেঁথে গেলেই আমরা এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পাব—হাতে যা-ই থাকুক বা না থাকুক।



