জাপানে ইসলামের উত্থান: জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বর্তমান চিত্র
জাপানে ইসলামের উত্থান: জনসংখ্যা ও বর্তমান চিত্র

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, শৃঙ্খলাবোধ এবং হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত জাপান। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি ধর্মীয়ভাবে বৌদ্ধ ও শিন্টো ঐতিহ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত থাকলেও, গত কয়েক দশকে সেখানে নীরবে এক নতুন পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। অভিবাসন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং স্থানীয়দের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি ইসলামও ধীরে ধীরে দেশটির বহুসাংস্কৃতিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হচ্ছে। তবে এই অগ্রযাত্রার পাশাপাশি মুসলিম সম্প্রদায়কে মোকাবিলা করতে হচ্ছে নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জও। ইতিহাস থেকে বর্তমান পর্যন্ত জাপানে ইসলামের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

জনসংখ্যা ও বর্তমান চিত্র

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানে মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১০ সালে জাপানে মুসলিমের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার। ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ তা প্রায় ১১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজারে। গবেষকদের (যেমন: ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিরোফুমি তানাদা) মতে, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজারে উন্নীত হয়েছে, যা জাপানের মোট জনসংখ্যার (প্রায় ১২ কোটি ৬০ লাখ) আনুমানিক ০.৩ শতাংশ।

জাপানে বসবাসরত মুসলিমদের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশি বংশোদ্ভূত অভিবাসী এবং বাকি ১০ শতাংশ স্থানীয় জাপানি নবমুসলিম। রাজধানী টোকিওতে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় জনবসতি গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া ওসাকা, নাগোয়া, ইয়োকোহামা, হিরোশিমা ও কিয়োটোসহ বড় বড় শহরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম বসবাস করছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইসলামের আগমন ও ঐতিহাসিক পথরেখা

প্রাথমিক যোগাযোগ (১৮৬৮ সালের পূর্বে)

অষ্টম শতকের দিকে বাণিজ্যিক রুটের মাধ্যমে জাপানের সঙ্গে ইসলামি সভ্যতার প্রথম পরোক্ষ যোগাযোগের সূচনা হয়। পারস্যের মানচিত্রবিদ ইবনে খোরদাদবেহ তার লেখায় জাপানকে ‘ওয়াকওয়াক’ (Waqwaq) নামে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে একাদশ শতকে মাহমুদ কাশগারির মানচিত্রেও সিল্ক রোডের পূর্ব প্রান্তে জাপানের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১২৭৫ সালে ইউয়ান (Yuan) চীন থেকে ‘সদর উদ-দীন’ (Sadr ud-Din) নামের এক মুসলিম কূটনৈতিক দূত জাপানে আসেন। পরবর্তীকালে তাকে শিরশ্ছেদ করা হয়। পরে ১৭ শতকে থাইল্যান্ড হয়ে ইরানি বণিকেরা নাগাসাকিতে আসেন। শিয়া লেখক মোহাম্মদ ইবরাহিম তার ‘সাফিনে-ই সুলায়মানি’ গ্রন্থে জাপানের সমসাময়িক বিবরণও লিপিবদ্ধ করেন।

আধুনিক যুগের সূচনা (১৯ শতকের শেষভাগ)

১৮৭৭ সালে জাপানি ভাষায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী প্রথম অনূদিত হয়। এর মাধ্যমে জাপানি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে তাত্ত্বিক পরিচিতি তৈরি হয়।

১৮৯০ সালে অটোমান সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে ‘আরতুগরুল’ (Ertugrul) নামের একটি যুদ্ধজাহাজ জাপানে পাঠান। ফেরার পথে ভয়াবহ ঝড়ে জাহাজটি ডুবে যায়। ৬০৯ জন আরোহীর মধ্যে ৫৪০ জন প্রাণ হারান। এই দুর্ঘটনার পর শওতারো নোদা নামের এক জাপানি সাংবাদিক জীবিত অটোমান নাবিকদের সঙ্গে কনস্টান্টিনোপলে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাকে প্রথমদিকের জাপানি মুসলিমদের অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়। একই সময়ে তোরাজিরো ইয়ামাদা (আবদুল খলিল) নামের আরেকজন জাপানিও ইসলাম গ্রহণ করেন।

২০ শতকের প্রথমার্ধ ও প্রথম মসজিদ

১৯০৯ সালে মিতসুতারো তাকাওকা (ওমর ইয়ামাওকা) ভারতের বোম্বেতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং প্রথম জাপানি হিসেবে হজ পালন করেন। একই সময়ে ব্যবসায়ী বুমপাচিরো আরিগাও (আহমাদ) ভারত সফরকালে ইসলাম গ্রহণ করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও বলশেভিক বিপ্লবের পর মধ্য এশিয়া ও রাশিয়া থেকে আগত তাতার, উজবেক, তাজিক, কিরগিজ ও কাজাখ মুসলিম শরণার্থীরা জাপানে বসতি স্থাপন করেন। তাদের হাত ধরেই জাপানে প্রথম মুসলিম সমাজ ও মসজিদ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি গড়ে ওঠে।

কোবে মসজিদ (Kobe Mosque)

১৯৩৫ সালে হাইওগো প্রশাসনিক অঞ্চলের কোবে শহরে চেক স্থপতি জান জোসেফ শভাগরের নকশায় ঐতিহ্যবাহী ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যশৈলীতে এটি নির্মিত হয়। এটি জাপানের প্রথম স্থায়ী মসজিদ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমাবর্ষণ ও ১৯৯৫ সালের গ্রেট হানশিন ভূমিকম্প—উভয় দুর্যোগই অক্ষত অবস্থায় অতিক্রম করে।

১৯৩৮ সালে তাতার মুসলিমদের উদ্যোগে প্রথম নির্মিত এই মসজিদটি ২০০০ সালে অটোমান স্থাপত্যশৈলীতে পুনর্নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এটি জাপানের বৃহত্তম ও সবচেয়ে পরিচিত মসজিদ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তেলসংকট (১৯৭৩)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জাপানের সামরিক সরকার অধিকৃত মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে ইসলামবিষয়ক গবেষণা ও প্রকাশনায় উৎসাহ দেয়। সে সময় শতাধিক বই ও সাময়িকী প্রকাশিত হয়। তবে যুদ্ধ শেষে এই ধারা থেমে যায়।

পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের বৈশ্বিক তেলসংকটের পর আরব বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির ফলে জাপানি গণমাধ্যমে ইসলাম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এ সময় বহু জাপানি ইসলাম গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই সক্রিয়ভাবে মুসলিম পরিচয় ধরে রাখেননি।

সমসাময়িক জীবনযাত্রা, হালাল পর্যটন ও সামাজিক পরিবর্তন

বর্তমানে জাপানে মুসলিমদের জীবনযাত্রায় আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাব সুস্পষ্ট। একই সঙ্গে মুসলিম পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় ‘হালাল টুরিজম’ জাপানের পর্যটন খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। দেশজুড়ে দ্রুত বাড়ছে হালাল রেস্তোরাঁ, মুসলিমবান্ধব হোটেল এবং নামাজ আদায়ের নির্ধারিত স্থান।

বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সামাজিক টানাপোড়েন

জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও জাপানের মুসলিম সমাজকে এখনও নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন মসজিদে আপত্তিকর ফোন কল ও ই-মেইলের ঘটনাও ঘটছে।

আরও একটি বড় সমস্যা হলো দাফনের ব্যবস্থা। জাপানি সংস্কৃতিতে সাধারণত মৃতদেহ দাহ করা হয় এবং পরে বৌদ্ধ কবরস্থানে ছাই সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু ইসলামে দাফনের বিধান থাকায় মুসলিমদের জন্য উপযুক্ত কবরস্থানের সংকট এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও প্রশাসনিক সমস্যা।

শিক্ষাক্ষেত্রেও মুসলিম পরিবারগুলোকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। জাপানে ইসলামি কিন্ডারগার্টেন বা পূর্ণাঙ্গ ইসলামি বিদ্যালয় খুবই সীমিত। ফলে মুসলিম শিশুদের ধর্মীয় পরিচয় ও মূল্যবোধ সংরক্ষণে পরিবারগুলোকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হয়।

অন্যদিকে জাপানের একটি বড় জনগোষ্ঠী বৌদ্ধ বা শিন্টো ধর্মাবলম্বী হলেও নতুন প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম অনুসরণ করে না। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে জাপানি ভাষায় ইসলামের সঠিক পরিচয় পৌঁছে দেওয়ার মতো দক্ষ দাঈ ও গবেষকেরও অভাব রয়েছে।

তবুও জাপানের মুসলিম সম্প্রদায় আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক সংগঠিত, সচেতন এবং সমাজের সঙ্গে ইতিবাচক সহাবস্থান গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

জাপানে ইসলামের ইতিহাস সংখ্যায় নয়, বরং ধৈর্য, অভিযোজন এবং সহাবস্থানের এক অনন্য কাহিনী। কয়েকজন পথিকৃৎ মুসলিম থেকে শুরু হয়ে আজ একটি ক্রমবর্ধমান সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে জাপানের মুসলিম সমাজ। যদিও সামনে রয়েছে নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ, তবুও হালাল অবকাঠামোর বিস্তার, স্থানীয়দের ইসলাম গ্রহণ, আন্তধর্মীয় সংলাপ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সংগঠিত প্রচেষ্টা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করছে। প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যের এই দেশে ইসলাম যে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করছে, তা নিঃসন্দেহে সমসাময়িক বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা।

—দ্য মাইনিচি অবলম্বনে