রমজান শেষ হলেই আমল শেষ? 'রমজানি' না 'রব্বানি' হওয়ার সংকটে মুসলিম সমাজ
রমজান শেষ হলেই আমল শেষ? 'রমজানি' বনাম 'রব্বানি' হওয়ার সংকট

রমজান শেষ হলেই আমল শেষ? 'রমজানি' না 'রব্বানি' হওয়ার সংকটে মুসলিম সমাজ

রমজান মাসের সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই মুসলিম সমাজে একটি লক্ষণীয় ও উদ্বেগজনক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। পুরো মাসজুড়ে মুসল্লিতে পরিপূর্ণ থাকা মসজিদগুলো ঈদের পরদিন থেকেই ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে শুরু করে। যিনি রমজানে মিথ্যা, গিবত ও অনৈতিক কাজ থেকে দূরে থাকতেন, শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠার পরই তিনি আবার পুরনো অভ্যাসে ফিরে যান।

ধর্মীয় ধারণার ভুল প্রয়োগ ও সময়ের ফ্রেমে বাঁধা বিশ্বাস

সমাজের একটি বড় সমস্যা হলো ধর্মকে নির্দিষ্ট কিছু অনুষ্ঠান বা সময়ের ফ্রেমে বেঁধে ফেলা। অনেকে মনে করেন, রমজান মানেই কেবল শুদ্ধ হওয়ার সময়, আর বাকি একাদশ মাস নিজের ইচ্ছামতো চলার সুযোগ। এই ধারণাটি ইসলামি দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।

প্রশ্ন জাগে: তবে কি আমাদের ইবাদত ও নৈতিকতা কেবল একটি মাসের জন্যই সীমাবদ্ধ? আমরা কি কেবল রমজানের রবের ইবাদত করি, নাকি সারা বছরের রবের?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

'রমজানি' বনাম 'রব্বানি': দুই ধরনের মুসলমানের বিভাজন

আলেমরা বর্তমান সময়ের এই অদ্ভুত অবস্থাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন:

  • রমজানি: যারা কেবল রমজান এলেই ধার্মিক হয় এবং মাস শেষ হলে ধর্মকে বিদায় জানায়।
  • রব্বানি: যারা সবসময় আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ অনুসরণ করে ও ধর্মকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে মেনে চলে।

বিখ্যাত আলেম শেখ মুহাম্মদ সালেম ইবনে আবদুল ওয়াদুদকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, শয়তানদের কখন মুক্তি দেওয়া হয়? তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, 'ঈদের নামাজের পরপরই; কারণ এরপরই মানুষের আচরণে ব্যাপক বিচ্যুতি দেখা যায় এবং মসজিদগুলো খালি হয়ে যায়।'

ইসলাম: একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সাপ্তাহিক জুমা এবং বার্ষিক হজের মাধ্যমে মানুষকে সারাবছরই একটি আধ্যাত্মিক কাঠামোর মধ্যে রাখে। রমজান ছিল এই কাঠামোর একটি নিবিড় প্রশিক্ষণকাল মাত্র, চূড়ান্ত গন্তব্য নয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যদি রমজানের পর আমাদের আচরণে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন না আসে, তবে বুঝতে হবে আমাদের রোজা কেবল উপবাসই ছিল, তা আত্মিক পরিবর্তনের ছোঁয়া পায়নি। রমজান আমাদের জন্য একটি সূচনাবিন্দু হওয়া উচিত, শেষ বিন্দু নয়।

সামষ্টিক অনগ্রসরতার কারণ ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি

জাতির এই চারিত্রিক বৈপরীত্য আমাদের সামষ্টিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা সৃষ্টি করে। যখন একটি বিশাল জনগোষ্ঠী মাত্র ত্রিশ দিনের জন্য নিজেদের নফস বা প্রবৃত্তিকে জয় করার পর আবার পরাজয় বরণ করে, তখন সেই জাতির পক্ষে বড় কোনো বিজয় অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ইতিহাসের সোনালি সময়ের মুসলিমরা 'রমজানি' ছিলেন না, তারা ছিলেন 'রব্বানি'। তাদের ইবাদত ও নৈতিকতা কোনো ক্যালেন্ডারের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না বলেই তারা বিশ্বজয়ী হতে পেরেছিলেন।

নৈতিকতার ধারাবাহিকতা রক্ষার আহ্বান

রমজান আমাদের যে উন্নত চরিত্র, সহনশীলতা ও আত্মসংযমের শিক্ষা দিয়েছে, তা ঈদের দিনেই বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। রমজানের পবিত্রতা ধরে রাখা মানেই হলো পরবর্তী এগারো মাস সেই শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানো। প্রকৃত সফল সেই ব্যক্তি, যার রমজান পরবর্তী জীবন রমজানের চেয়েও সুন্দর, মার্জিত ও নৈতিকতাপূর্ণ হয়।

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে কেবলমাত্র একটি মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারাবছর ধরে চলমান আমল ও নৈতিকতার চর্চাই পারে ব্যক্তি ও সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে।