মদিনার বনি হারাম মসজিদ: খন্দক যুদ্ধের অলৌকিক মেজবানির স্মৃতিবাহী স্থান
বনি হারাম মসজিদ: খন্দক যুদ্ধের অলৌকিক মেজবানির স্মৃতি

মদিনার বনি হারাম মসজিদ: খন্দক যুদ্ধের অলৌকিক মেজবানির স্মৃতিবাহী স্থান

মদিনার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত প্রাচীন জনপদটি ছিল বনি হারাম গোত্রের আবাসস্থল। এই গোত্রের নামানুসারেই সেখানে নির্মিত মসজিদের নাম রাখা হয়েছে ‘মসজিদ বনি হারাম’। খন্দক বা পরিখা যুদ্ধের সময় এই স্থানটি ছিল এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মুসলিম সৈন্যরা যখন মদিনা রক্ষার জন্য পরিখা খনন করছিলেন, তখন তাঁদের তাবুগুলো ছিল এই এলাকায়। তবে এই স্থানটি ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে আছে এক অলৌকিক ভোজ বা মেজবানির জন্য, যা সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)-এর ঘরে সংঘটিত হয়েছিল।

খন্দক যুদ্ধের কঠিন পরীক্ষা ও ক্ষুধার্ত অবস্থা

পরিখা যুদ্ধ ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। একদিকে আরবের সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণ, অন্যদিকে তীব্র শীত ও খাদ্যাভাব। সাহাবিরা পেটে পাথর বেঁধে পরিখা খনন করছিলেন। জাবির (রা.) লক্ষ করলেন, প্রচণ্ড ক্ষুধার কারণে নবীজির (সা.) পবিত্র চেহারায় ক্লান্তির ছাপ ফুটে উঠেছে। তাঁর কোমরে পাথর বাঁধা ছিল। এই দৃশ্য দেখে তিনি গভীরভাবে ব্যথিত হলেন এবং লুকিয়ে নবীজির জন্য মেজবানির পরিকল্পনা করলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১০১)

সামান্য আয়োজন ও নবীজির আহ্বান

জাবির (রা.) দ্রুত বাড়ি গিয়ে তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাড়িতে কোনো খাবার আছে কি? আমি নবীজিকে ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখে এসেছি।’ স্ত্রী জানালেন, বাড়িতে মাত্র এক ‘সা’ (সাড়ে তিন কেজি প্রায়) বার্লি এবং একটি ছোট বকরির ছানা আছে। হজরত জাবির বকরিটি জবাই করলেন এবং তাঁর স্ত্রী বার্লি পিষে আটা তৈরি করলেন। তারপর চুপিসারে নবীজির কানে কানে গিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমাদের বাড়িতে সামান্য খাবার আছে, আপনি আপনার সঙ্গে দু-একজন সঙ্গী নিয়ে আমাদের ঘরে মেহমান হোন।’ তিনি চেয়েছিলেন নবীজি যেন পেটভরে খেতে পারেন, কারণ আয়োজনটি ছিল বড়জোর ৪-৫ জনের। কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) দাঁড়িয়ে পুরো পরিখা খননকারী বাহিনীকে ডেকে বললেন, ‘হে পরিখা খননকারী দল, জাবির তোমাদের জন্য খাবারের আয়োজন করেছে, চলো সবাই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২০৩৯)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বরকতের অলৌকিক নিদর্শন ও বিস্ময়কর মেজবানি

নবীজির এই ঘোষণায় জাবির (রা.) কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়লেন এবং বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীকে সব খুলে বললেন। স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি নবীজিকে আয়োজনের পরিমাণ জানিয়েছিলে?’ জাবির (রা.) বললেন, ‘হ্যাঁ।’ স্ত্রী তখন বললেন, ‘তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১০২) নবীজি (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন যে তিনি না আসা পর্যন্ত যেন রুটি সেঁকা না হয় এবং মাংসের ডেকচি চুলা থেকে নামানো না হয়। তিনি সেখানে পৌঁছে ডেকচি ও আটার খামিরের মধ্যে নিজের পবিত্র লালা মিশিয়ে বরকতের দোয়া করলেন। এরপর শুরু হলো ইতিহাসের সেই বিস্ময়কর মেজবানি:

  • নবীজি (সা.) নিজের হাতে ডেকচি থেকে মাংস এবং চুলা থেকে রুটি বের করে সাহাবিদের দিতে লাগলেন।
  • সাহাবিরা ১০ জন ১০ জন করে ভেতরে প্রবেশ করছিলেন এবং পেট ভরে খেয়ে বেরিয়ে আসছিলেন।
  • জাবির (রা.) বিস্ময়ভরে লক্ষ করলেন, ডেকচি থেকে মাংস তোলা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ডেকচি পূর্ণই থাকছে। আটার খামির থেকে রুটি বানানো হচ্ছে, কিন্তু খামির শেষ হচ্ছে না।

সবশেষে প্রায় ১০০০ সাহাবি সেই সামান্য খাবার খেয়ে তৃপ্ত হলেন। সবার খাওয়া শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, মাংসের ডেকচিটি তখনও ফুটছে এবং আটার খামির আগের মতোই অবশিষ্ট আছে। নবীজি (সা.) জাবিরের স্ত্রীকে বললেন, ‘এখন তোমরা নিজেরা খাও এবং অন্যদের উপহার হিসেবে পাঠাও, কারণ মানুষ এখন ক্ষুধার্ত।’

ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে বনি হারাম মসজিদ

মদিনার বনি হারাম গোত্রের স্থানে নির্মিত হয়েছে একটি মসজিদ, যা আজও সেই বরকতময় ঘটনার স্মৃতি বহন করে চলেছে। যদিও সাহাবির মূল ঘরটি এখন আর নেই, তবে মসজিদের অবস্থানটি বিশ্বাসীদের সেই অলৌকিক দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি ছিল নবুয়তের এক জীবন্ত মোজেজা বা অলৌকিক নিদর্শন। এই ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয় যে আল্লাহর পথে ত্যাগ স্বীকার করলে আল্লাহ তাআলা সামান্য জিনিসেও অসামান্য বরকত দান করেন।