মব সংস্কৃতি: ইসলামের দৃষ্টিতে জনতার উন্মত্ততা ও ন্যায়বিচারের পথ
মব সংস্কৃতি: ইসলামে জনতার উন্মত্ততা ও ন্যায়বিচার

মব সংস্কৃতি: ইসলামের দৃষ্টিতে জনতার উন্মত্ততা ও ন্যায়বিচারের পথ

মব শব্দটি ল্যাটিন শব্দ ‘মব ভালগাস’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘উত্তেজিত জনতা’। সমাজ বিজ্ঞানীরা একে ক্রাউড সাইকোলজি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সতেরো শতকের ফরাসি বিপ্লবের সময় মব দ্বারা মানুষ হত্যা এবং উনিশ ও বিশ শতকে আমেরিকায় মব সংস্কৃতি দেখা গেছে। ইসলামের ইতিহাসেও মব ভায়োলেন্সের উদাহরণ রয়েছে, যা ইসলামিক স্কলাররা নিকট গর্হিত, নিন্দনীয় ও বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ইতিহাসে মবের করুণ উদাহরণ

তৃতীয় খলিফ উসমান (রা.)-এর হত্যাকাণ্ড ইসলামের প্রথম মব হিসেবে বিবেচিত, যেখানে ‘তৌহিদী জনতা’র মতো একটি গ্রুপ তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে এবং তাকে কুরআন পাঠ অবস্থায় হজের পবিত্র দিনগুলোতে হত্যা করে। পরবর্তীতে সংগঠিত ‘উষ্টের যুদ্ধ’ (জংগে জামাল) এবং সিফফিনের যুদ্ধকেও মবের প্রতিক্রিয়া বলা যায়, যেখানে হাজার হাজার নিরপরাধ সাহাবি নিহত হন।

আজকের সমাজে মব সংস্কৃতির বৃদ্ধি

আজকের পৃথিবীতে, বিশেষ করে আমাদের সমাজে, মব বা জনতার উন্মত্ত ভিড়ের মাধ্যমে কাউকে হেনস্তা করা, সামাজিকভাবে অপমান করা, কিংবা কোনও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে অনেক ইসলামিক ব্যক্তিত্বও এই গর্হিত কাজকে সমর্থন দিচ্ছেন এবং এর বিরুদ্ধে মানুষদের সতর্ক করা হতে বিরত থাকছেন। অনেক সময় মানুষ মনে করে, ‘অনেকেই তো বলছে, নিশ্চয়ই সে অপরাধী।’ কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়, সত্য কখনও জনতার সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না।

কুরআন ও হাদিসে মব ভায়োলেন্সের নিষেধাজ্ঞা

কুরআন ও হাদিস মব ভায়োলেন্স হারাম ঘোষণা করেছে এবং অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথ হলো তদন্ত, প্রমাণ এবং সুবিচার; জনতার আবেগ নয়। কুরআন মানুষকে প্রথমেই সতর্ক করে দিয়েছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত সবসময় সত্য নয়। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তুমি পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কথা মানো, তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। তারা তো কেবল অনুমান অনুসরণ করে।’ (সুরা আল-আন-আম ৬:১১৬)।

যাচাই ছাড়া অভিযোগ গ্রহণ করা হারাম

মব তৈরির সবচেয়ে বড় কারণ হলো, যাচাই না করে খবর বিশ্বাস করা। কুরআন এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনও ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনও সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করে নাও; নতুবা অজ্ঞতাবশত কোনও সম্প্রদায়কে আঘাত করবে এবং পরে তোমাদের কাজের জন্য অনুতপ্ত হবে।’ (সুরা আল-হুজুরাত ৪৯:৬)। আজকের যুগে একটি গুজব, একটি ভিডিও ক্লিপ, একটি ফেসবুক পোস্ট কয়েক মিনিটেই হাজার মানুষের ক্ষোভ তৈরি করে। কিন্তু কুরআন বলছে, প্রথমে যাচাই করো। যাচাই ছাড়া কাউকে অপমান করা বা শাস্তি দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অন্যায়।

অপবাদ ছড়ানো একটি বড় গুনাহ

অনেক সময় মব তৈরি হয় গুজব ও অপবাদের ওপর ভিত্তি করে। কুরআনে অপবাদ সম্পর্কে কঠোর ভাষায় বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমানদার নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয় এবং চার জন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদের ৮০ বেত্রাঘাত করো এবং কখনও তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না।’ (সুরা আন-নূর ২৪:৪)। এখানে লক্ষণীয়, শুধু অভিযোগ করলেই ইসলাম তা গ্রহণ করেনি। চার জন প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছাড়া এমন অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। আজকের মব বিচার এই নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

গিবত ও অপমানের বিরুদ্ধে কুরআনের সতর্কবাণী

মবের মধ্যে সাধারণত যে কাজটি বেশি ঘটে তা হলো, গিবত, অপমান এবং চরিত্রহরণ। কুরআন এ বিষয়ে বলেছে, ‘তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে?’ (সুরা আল-হুজুরাত ৪৯:১২)। এই আয়াতের ভাষা এতটাই শক্তিশালী যে মানুষের অন্তর কেঁপে ওঠে। কাউকে সম্মিলিতভাবে অপমান করা, এটি ইসলামে ঘৃণ্য কাজ।

কারো সম্মান নষ্ট করা ভয়াবহ অপরাধ

মানুষের সম্মানের মূল্য ইসলাম অত্যন্ত উঁচুতে স্থাপন করেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘একজন মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান– সবই অন্য মুসলিমের জন্য হারাম।’ (সহীহ মুসলিম, হাদিস ২৫৬৪)। মব সংস্কৃতিতে সাধারণত এই দুটি জিনিসই ঘটে, জিহ্বার আঘাত, কখনও হাতের আঘাত। এ কারণে এটি ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ।

বিচার করার অধিকার কার?

মব সংস্কৃতির একটি বড় সমস্যা হলো, মানুষ নিজেই বিচারক হয়ে যায়। কিন্তু ইসলামে বিচার করার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর জন্য সাক্ষ্য দাও।’ (সুরা আন-নিসা ৪:১৩৫)। বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন প্রমাণ, সাক্ষ্য, নিরপেক্ষ বিচার। উন্মত্ত জনতা কখনও বিচারক হতে পারে না।

মবের পেছনে শয়তানের কৌশল

মব সংস্কৃতি মূলত আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। শয়তান মানুষের আবেগকে উসকে দেয়। কুরআন বলে, ‘শয়তান মানুষের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায়।’ (সুরা আল-মায়িদা ৫:৯১)। যখন মানুষ আবেগের বশে বিচার করে, তখন শয়তান তার উদ্দেশ্যে সফল হয়।

অন্যায়ভাবে কাউকে অপমান করলে কী হয়?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইকে অপমান করে, আল্লাহ তাকে অপমানিত করবেন।’ (তিরমিজি)। আরেকটি হাদিসে এসেছে, ‘মুসলমান সে, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি)। মব সংস্কৃতিতে সাধারণত এই দুটি জিনিসই ঘটে, জিহ্বার আঘাত, কখনও হাতের আঘাত। এ কারণে এটি ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ।

ইতিহাসে মবের করুণ উদাহরণ: হাদিসাতুল ইফক

ইসলামের ইতিহাসেও একবার একটি বড় গুজব ছড়িয়েছিল, যা ইতিহাসে ‘হাদিসাতুল ইফক’ নামে পরিচিত। এই ঘটনায় মুমিনদের মা হযরত আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ানো হয়েছিল। কিন্তু পরে কুরআনের আয়াত নাজিল হয়ে তার পবিত্রতা ঘোষণা করে। এই ঘটনায় আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যখন এই অপবাদ শুনেছিলে, তখন কেন মুমিন পুরুষ ও নারীরা নিজেদের সম্পর্কে ভালো ধারণা করেনি?’ (সুরা আন-নূর ২৪:১২)। এখান থেকে শিক্ষা হলো, গুজব শুনে জনতার সঙ্গে ভেসে যাওয়া মুমিনের কাজ নয়।

সত্যিকারের মুমিনের বৈশিষ্ট্য

একজন প্রকৃত মুমিন কেমন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মুমিন সে ব্যক্তি, যার কাছ থেকে মানুষের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ থাকে।’ (সুনান নাসাঈ)। অর্থাৎ একজন মুমিন মানুষের নিরাপত্তার প্রতীক। মবের অংশ হওয়া এই পরিচয়ের বিপরীত।

সামাজিক মিডিয়া ও নতুন যুগের মব

আজকের যুগে মব সবসময় রাস্তায় তৈরি হয় না। অনেক সময় তা তৈরি হয় ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারে। একটি পোস্ট হাজার মানুষের ক্ষোভ তৈরি করে। কিছু ইউটিউবার ভিউয়ের জন্য গুজব ছড়িয়ে রাষ্ট্রে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করে। কিন্তু কুরআনের নীতি একই, যাচাই ছাড়া বিশ্বাস নয়।

ন্যায়বিচারের ইসলামী নীতি

ইসলাম বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি মূলনীতি দিয়েছে:

  • যাচাই (সুরা হুজুরাত ৪৯:৬)
  • সাক্ষ্য (সুরা নূর ২৪:৪)
  • ন্যায় (সুরা নিসা ৪:১৩৫)
  • অপবাদ নিষিদ্ধ (সুরা নূর ২৪:১১)

এই নীতিগুলো ছাড়া বিচার করলে তা জুলুম হয়ে যায়।

একজন মুমিনের করণীয়

যখন মব তৈরি হয়, তখন একজন সচেতন মুসলমানের করণীয়:

  1. গুজব যাচাই করা
  2. অন্যায়ে অংশ না নেওয়া
  3. নির্দোষ মানুষের সম্মান রক্ষা করা
  4. শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায় দেখবে, সে তা হাত দিয়ে প্রতিরোধ করবে; যদি না পারে, জিহ্বা দিয়ে; তাও না পারলে অন্তরে ঘৃণা করবে।’ (সহীহ মুসলিম)।

উপসংহার

মব সংস্কৃতি মূলত আবেগের বিস্ফোরণ, কিন্তু ইসলাম যুক্তি, ন্যায় ও প্রমাণের ধর্ম। কুরআন ও হাদিস আমাদের বারবার শেখায়, গুজব যাচাই করো, কারো সম্মান নষ্ট করো না, ন্যায়বিচারের পথে থাকো। কারণ জনতার আবেগ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু অন্যায়ের দাগ ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী। একজন মুসলমানের কাজ, ভিড়ের সঙ্গে ভেসে যাওয়া নয়, বরং সত্যের পাশে দাঁড়ানো। যে দিন আমাদের সমাজ এই শিক্ষা গ্রহণ করবে, সে দিন মব সংস্কৃতি নয়-ন্যায় ও মানবিকতার সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক: শিক্ষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও পিএইচডি গবেষক, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়া।