ফরিদপুরের ঐতিহাসিক পাথরাইল দিঘিরপাড় আউলিয়া মসজিদ: ছয় শ বছরের সাক্ষী
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পাথরাইল দিঘিরপাড় গ্রামে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ছয় শ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ। ‘পাথরাইল দিঘিরপাড় আউলিয়া মসজিদ’ নামের এই স্থাপনা বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীন সংরক্ষিত প্রত্ননিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত, যা স্থানীয় সম্প্রদায়ের গর্বের কেন্দ্রবিন্দু।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও নির্মাণকাল
ইতিহাসবিদদের ধারণা অনুযায়ী, এই মসজিদটি ১৩৯৩ থেকে ১৪১০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের আমলে ‘আউলিয়া খান জামে মসজিদ’ নামে নির্মিত হয়। মসজিদের দক্ষিণ পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন আউলিয়া মজলিস আউলিয়া খান, যার মাজার স্থানীয়দের জন্য আধ্যাত্মিক তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও, মসজিদ প্রাঙ্গণে মস্তান দরবেশ নাজিমদ্দিন দেওয়ানের মাজার এবং আউলিয়া খানের মাজারের দক্ষিণ পাশে ফকির ছলিমদ্দিন দেওয়ানের মাজার অবস্থিত, যা এই স্থানের ধর্মীয় গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
স্থাপত্য শৈলী ও নকশার বৈশিষ্ট্য
আয়তাকার এই মসজিদটি বহু গম্বুজবিশিষ্ট, যার নকশা ও স্থাপত্যশৈলীতে রাজশাহীর ছোট সোনা মসজিদ ও বাঘা মসজিদের সঙ্গে স্পষ্ট সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। মসজিদের মূল প্রবেশদ্বার পূর্ব দিকে অবস্থিত, এবং ভেতরের ছাদে সমান উচ্চতার ১০টি গম্বুজ বিদ্যমান, যা সামান্য বাঁকানো ছাদের সাথে মিলে একটি অনন্য দৃশ্য তৈরি করেছে।
- মসজিদের পূর্ব দিকে পাঁচটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে দুটি করে প্রবেশপথ রয়েছে।
- দেয়ালের চার কোণে চারটি স্তম্ভ এবং ভেতরে আলাদাভাবে দাঁড়িয়ে থাকা আরও চারটি স্তম্ভ মেঝেকে দুটি আইলে বিভক্ত করেছে।
- প্রতিটি দেয়ালের প্রস্থ প্রায় দুই মিটার, এবং নামাজকক্ষের আয়তন ২১ দশমিক ৭৯ বাই ৮ দশমিক ৬ মিটার, সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিটার।
- দেয়ালে আয়তাকার টেরাকোটা নকশার অলংকরণ শোভা পাচ্ছে, যা মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
স্থানীয় ব্যবহার ও সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ
মসজিদের মুয়াজ্জিন আবুল বাশার জানান, ভেতরে একসঙ্গে প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন, এবং ভিড় বেশি হলে মসজিদের ফটকের সামনে ছাউনির ব্যবস্থা করে নামাজের সুযোগ দেওয়া হয়। তবে, সম্প্রতি এলাকায় চুরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত ৭ মার্চ ভোরে মসজিদের দানবাক্স চুরি হয়েছে, যেখানে অন্তত লক্ষাধিক টাকা সংরক্ষিত ছিল, যা স্থানীয় উন্নয়ন কাজে ব্যবহৃত হতো।
আজিমনগর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য টিটু মুন্সী উল্লেখ করেন, দানের টাকায় মসজিদের উন্নয়নকাজ পরিচালিত হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের অন্যান্য মসজিদ কমিটির মতো এখানকার কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়েছে, ফলে বর্তমানে কোনো বৈধ কমিটি নেই, যা রক্ষণাবেক্ষণে কিছুটা জটিলতা সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও পর্যটন সম্ভাবনা
এলাকার বাসিন্দা ও কলেজছাত্র সাব্বির খন্দকার বলেন, ‘আমাদের এলাকায় প্রায় ছয় শ বছরের পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী মসজিদ আছে—এটা ভাবতেই গর্ব হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে মসজিদটি দেখতে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। বিশেষ করে প্রতি শুক্র ও শনিবার হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে, এবং ঈদের দিনগুলোতে ভিড় আরও বেড়ে যায়।’ এই মসজিদটি শুধু ধর্মীয় স্থানই নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে বিকশিত হচ্ছে, যা ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করছে।
