রমজানের ঐতিহাসিক ইফতার আয়োজন: সাহাবা থেকে খলিফাদের মানবিক উদ্যোগ
পবিত্র মাহে রমজানকে আধ্যাত্মিকতার বসন্তকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মাসটি ইবাদতের পাশাপাশি উদারতা, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্বের মানবিক স্পন্দনকে জাগ্রত করে। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগেই রমজান মাসকে ঘিরে এক বিশাল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়েছিল।
সাহাবাদের সময়ে ইফতারের সূচনা
রমজানে মানুষকে ইফতার করানোর মূল দর্শনটি সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ থেকে উদ্ভূত। তিনি সাহাবিদের মধ্যে ইফতার ও সাহরিতে দাওয়াতের আয়োজন করার সুন্নত চালু করেছিলেন। জায়েদ বিন সাবিত (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আমরা নবিজি (সা.)-এর সাথে সাহ্রি খেলাম, তারপর তিনি নামাজের জন্য দাঁড়ালেন।’ (সহিহ বোখারি, হাদিস: ১৯২১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৮০৭)।
ওসমান (রা.) উদ্যোগী হয়ে ‘রমজানের খাবার’-এর ব্যবস্থা করেন এবং বলেন, ‘এটি সেই ইবাদতকারীর জন্য যে মসজিদে অবস্থান করে, মুসাফিরদের জন্য এবং রমজানে অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য।’ ইমাম ইবনে তাইমিয়া তাঁর আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘মানুষকে খাবারের জন্য একত্রিত করা এবং রমজান মাসে অভাবীদের অন্ন-দানের মাধ্যমে সাহায্য করা ইসলামের অন্যতম সুন্নত।’
খেলাফত যুগে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
খেলাফতের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে ইফতার আয়োজনের পরিধিও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়া (রা.) মক্কায় ‘দারুল মারাজিল’ বা কড়াই ঘর নামে একটি ভবন নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন, যেখানে বিশাল পিতলের কড়াইয়ে দিনরাত রান্না চলত। (আজরকি, আখবারু মক্কা)। ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ প্রতিদিন এক হাজার দস্তরখান বিছাতেন এবং নিজে ঘোড়ায় চড়ে মেহমানদের খাওয়া পর্যবেক্ষণ করতেন। (বালাজুরি, আনসাবুল আশরাফ)।
আব্বাসীয় যুগে এই প্রথা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। খলিফা আন-নাসির লি-দিনিল্লাহ বাগদাদের অলিতে-গলিতে ‘অতিথিশালা’ বা ‘দুরুদ দিয়াফাহ’ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে প্রত্যেককে এক বাটি গোশতের ঝোল ও উন্নত মানের রুটি দেওয়া হতো। খলিফারা বিশ্বাস করতেন যে প্রজাদের অভুক্ত রেখে নিজেরা ইফতার করা খিলাফতের আদর্শের পরিপন্থী। (ইবনুল আসির, আল কামিল)।
বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রসারণ
দ্বিতীয় হিজরি শতকের শেষভাগ থেকে আব্বাসীয় খেলাফতের অধীনে বিভিন্ন স্বাধীন উপ-রাষ্ট্র গড়ে উঠলে, আমিররা রমজানের এই জনকল্যাণমূলক ব্যয়কে প্রজাদের সাথে সম্পর্ক মজবুত করার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক ইজ্জুদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ তাঁর আল-আলাকুল খাতিরা গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, আমির সাইফুদ দৌলা আল-হামদানির ‘কালুফাহ’ নামক জায়গির শুধুমাত্র ‘রমজানের দস্তরখানের’ জন্য বরাদ্দ ছিল।
মিসরের ফাতেমীয় খিলাফতের ইফতার আয়োজন ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আল-কালকাশান্দির সুবহুল আ’শা গ্রন্থে বর্ণিত আছে, খলিফা তাঁর প্রাসাদের ‘স্বর্ণকক্ষে’ প্রতিদিন আমির-ওমরার জন্য ভোজের আয়োজন করতেন, যেখানে ২১টি বিশাল থালায় আস্ত ঝলসানো ভেড়া ও শত শত পাখির ভুনা সাজানো থাকত। এই খাবার কায়রোর সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হতো।
সামাজিক ঐক্য ও দায়িত্ববোধ
বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর রিহলাহ গ্রন্থে দামেস্কের মানুষের চিত্র এঁকেছেন, যেখানে রমজানে কখনো একা ইফতার করা হতো না। ধনীরা গরিবদের দাওয়াত দিত, আর সাধারণ মানুষ মসজিদে যার যার খাবার নিয়ে এসে একসাথে বসে ইফতার করত। এই সামাজিক ঐক্যই ইসলামি সভ্যতার প্রাণশক্তি হিসেবে কাজ করত। দুর্ভিক্ষ বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময় শাসকরা দরিদ্রদের সাহায্যের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন, যেমন দামেস্কে একবার খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে সুলতানের প্রতিনিধি দরিদ্র মানুষকে সামর্থ্যবান আমির ও বিচারকদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন।
রমজানের ইফতার আয়োজন কেবল একটি ধর্মীয় রীতি নয়, বরং এটি ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাহাবা, খলিফা ও শাসকদের এই মহৎ উদ্যোগ আজও মুসলিম সমাজে প্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।



