ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া থেকে আধুনিক রাজনীতি: নিরাপদ শহর ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা
ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া ও আধুনিক রাজনীতির মিল

ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া: নিরাপত্তা ও জীবিকার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা

একজন নারী সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে রাতে নিরাপদে ফিরবেন, পকেটে টাকা থাকলে কেউ ছিনিয়ে নেবে না—এটিই একটি নিরাপদ শহরের স্বপ্ন। অন্যদিকে, বেকারত্ব দূর হবে, খাবারে ভেজাল থাকবে না এবং সবার অন্ন সংস্থান হবে। মজার ব্যাপার হলো, এই দুটি বিষয় নতুন নয়; হাজার হাজার বছর আগে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়ায় এর প্রতিফলন ঘটেছে।

কোরআনে ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রার্থনা

সুরা বাকারার ১২৬ নম্বর আয়াতে ইব্রাহিম (আ.) মক্কা নগরীর জন্য দুটি জিনিস চেয়েছিলেন: ‘বালাদান আমিনা’ (একটি নিরাপদ শহর) এবং ‘ওয়ারজুক আহলাহু’ (অধিবাসীদের জন্য রিজিক)। তিনি মক্কাকে এমন একটি ভূখণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চেয়েছিলেন যেখানে মানুষ ভয়মুক্ত থাকবে এবং তাদের জীবিকার অভাব হবে না। কোরআনে তার প্রার্থনা এভাবে উদ্ধৃত হয়েছে: ‘হে আমার প্রতিপালক, এই শহরকে নিরাপদ করে দাও এবং এর অধিবাসীদের ফলমূল দিয়ে রিজিক দান করো।’

ইমাম ইবনে কাসির তাঁর তাফসিরে লিখেছেন যে ইব্রাহিম (আ.)-এর এই দোয়া মক্কার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতিফলন। চার হাজার বছর আগের এই দোয়া আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বিশ্বের রাজনীতিবিদরা একই কথা বলছেন—নিরাপদ শহর ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

আধুনিক রাজনীতিতে এর প্রতিধ্বনি

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর অপরাধ বা ছিনতাইয়ের খবর এলে প্রার্থীরা এলাকা নিরাপদ করার প্রতিশ্রুতি দেন, যা ইব্রাহিম (আ.)-এর ‘রব্বিজআল হাজা বালাদান আমিনা’ দোয়ারই আধুনিক সংস্করণ। আবার বেকারত্ব দূর করার প্রতিশ্রুতি ‘ওয়ারজুক আহলাহু মিনাস সামারাত’-এর সমতুল্য। ইমাম কুরতুবি তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেছেন যে এই আয়াতে আল্লাহ রাষ্ট্র পরিচালনার দুটি মৌলিক স্তম্ভ নির্দেশ করেছেন: অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

কোরআন ও হাদিসের ব্যাখ্যা

সুরা কুরাইশেও আল্লাহ বলছেন: ‘যিনি তাদের ক্ষুধায় খাবার দিয়েছেন এবং ভয় থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন।’ ইমাম তাবারি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে আল্লাহ কোরাইশদের প্রতি তাঁর দুটি বিশেষ অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন—জীবিকার ব্যবস্থা এবং শত্রুদের ভয় থেকে রক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসে বলা হয়েছে: ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি নিরাপদে সকাল করল, তার শরীর সুস্থ থাকল এবং তার কাছে সেদিনের খাবার আছে—তার যেন পুরো দুনিয়া হাতে এসে গেল।’

মনোবিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য

আব্রাহাম মাসলো ১৯৫৪ সালে তাঁর ‘হায়ারার্কি অব নিডস’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে মানুষের মৌলিক চাহিদা দুটি: শারীরিক চাহিদা (খাদ্য, বাসস্থান) এবং নিরাপত্তা। কোরআন এই ধ্রুব সত্যটি চৌদ্দশ বছর আগেই বলেছে। ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়ায় ‘বালাদান আমিনা’ হলো মাসলোর ‘সেফটি নিডস’ এবং ‘ওয়ারজুক আহলাহু’ হলো ‘ফিজিওলজিক্যাল নিডস’।

আমাদের শিক্ষা

  • প্রথমত, কোরআন শুধু আধ্যাত্মিক কিতাব নয়; এতে রাষ্ট্রচিন্তা ও সমাজ ব্যবস্থার রূপরেখা বিদ্যমান।
  • দ্বিতীয়ত, মানুষের মৌলিক চাহিদা যুগে যুগে একই থাকে—ইব্রাহিম (আ.)-এর সময়েও মানুষ নিরাপত্তা ও জীবিকা চেয়েছে, আজও চায়।
  • তৃতীয়ত, যে নেতা নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারবেন, কোরআনের শিক্ষানুযায়ী তিনিই সফল বলে বিবেচিত হন।

নির্বাচনের মৌসুমে প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যায়, কিন্তু মূল কথা সেই দুটোই থাকে—নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জীবন। ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সভ্যতার ভিত্তি হলো নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।