সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ঐতিহাসিক জিন্দানি শরিফ মসজিদ: কয়েক শতাব্দীর ইসলামি ঐতিহ্যের সাক্ষী
সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ঐতিহাসিক জিন্দানি শরিফ মসজিদ

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ঐতিহাসিক জিন্দানি শরিফ মসজিদ: কয়েক শতাব্দীর ইসলামি ঐতিহ্যের সাক্ষী

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ এলাকার করতোয়া তীরে অবস্থিত জিন্দানি শরিফ মসজিদ কয়েক শতাব্দী ধরে চলনবিল অঞ্চলের ইসলামি ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। হজরত শাহ শরিফ জিন্দানি (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন এই মসজিদটি স্থানীয় সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। গতকাল শুক্রবার মসজিদ পরিদর্শন ও ঐতিহাসিক সূত্র ও স্থানীয় জনশ্রুতি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

মসজিদের অবস্থান ও যাতায়াত

মসজিদটি তাড়াশ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। বাস, অটোরিকশা বা ভ্যানে সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়। হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের মহিষলুটি এলাকা থেকে দক্ষিণে কয়েক কিলোমিটার গেলেও মসজিদটিতে পৌঁছানো সম্ভব।

হজরত শাহ শরিফ জিন্দানি (রহ.)-এর ইতিহাস

জনশ্রুতি অনুযায়ী, হজরত শাহ শরিফ জিন্দানি (রহ.) বোখারা অঞ্চলের জিন্দান নগরের এক সম্ভ্রান্ত রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেন। ধর্মচর্চা ও জ্ঞান অন্বেষণে নিবেদিত এই সাধক ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে ভারতবর্ষে আসেন। পরে তিনি বাংলার চলনবিল অঞ্চলের নওগাঁ এলাকায় আস্তানা স্থাপন করেন।

ধারণা করা হয়, ১৫২০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে হজরত শাহ শরিফ জিন্দানি (রহ.) তৎকালীন স্থানীয় রাজা ভানুসিংহের শাসনাধীন এলাকায় আগমন করেন। প্রচলিত লোককথায় আছে, তিনি অলৌকিক শক্তির অধিকারী ছিলেন এবং বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে নওগাঁ এলাকায় প্রবেশ করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় বহু মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং এলাকায় ধর্মীয় চেতনার বিস্তার ঘটে।

স্থাপত্য ও কাঠামো

হজরত শাহ শরিফ জিন্দানি (রহ.) মাজারের পাশে অবস্থিত প্রাচীন মসজিদটি মধ্যযুগীয় স্থাপত্যশৈলীর একটি অনন্য নিদর্শন। এর মাঝখানে একটি বড় গম্বুজ এবং চার কোণে চারটি ছোট গম্বুজ আছে। স্থাপনাটির বাইরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ ফুট, প্রস্থ ৩৩ দশমিক ৫ ফুট ও উচ্চতা প্রায় ২২ দশমিক ৫ ফুট। দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ৯ ফুট। মূল গম্বুজের উচ্চতা প্রায় ২৬ ফুট।

কারুকার্যময় এই মসজিদের ভেতরে পাঁচ সারিতে প্রায় ১০০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বাইরে আরও দুই সারিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন মুসল্লির জায়গা হয়। পরে মসজিদের উত্তর ও পূর্ব পাশে কিছু অংশ বর্ধিত করা হয়েছে।

মসজিদের পরিবেশ ও গুরুত্ব

মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে একটি প্রাচীন কবরস্থান এবং পশ্চিম পাশে একটি পুকুর। মসজিদের অভ্যন্তরে হজরত শাহ শরিফ জিন্দানি (রহ.)-এর কবর অবস্থিত, যা বহু মানুষের কাছে পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত। মসজিদের মুয়াজ্জিন কাজী জহির উদ্দিন বলেন, ‘১৯৬২ সাল থেকে এখানে খেদমত করে আসছি। মসজিদটির সৌন্দর্য অপরূপ। বিশেষ করে জুমার নামাজ আদায় করতে দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা আসেন।’

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাবেক উপপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘প্রায় প্রতি শুক্রবারই এখানে জুমার নামাজ আদায় করতে আসি। এত মানুষের সঙ্গে নামাজ আদায় করে একধরনের আলাদা প্রশান্তি অনুভব করি।’ রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া এলাকা থেকে গতকাল জুমার নামাজ পড়তে আসেন ইবনে আবদুল্লাহ সাদী। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই এখানে জুমার নামাজ পড়ার ইচ্ছা ছিল। অবশেষে কয়েকজন মিলে আজ আসতে পেরেছি।’

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকা

নওগাঁ জিন্দানি শরিফ মসজিদ ও মাজার শুধু ধর্মীয় স্থানই নয়, স্থানীয় মুসলমানদের সামাজিক ঐক্যেরও প্রতীক। প্রতিবছর চৈত্র মাসের প্রথম সপ্তাহে এখানে তিন দিনব্যাপী বার্ষিক ওরস মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ওরস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষ, দরবেশ ও সাধক এখানে সমবেত হন।

ওরসের শেষ দিনে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘বউমেলা’, সেখানে চলনবিল অঞ্চলের নারীদের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। এ সময় মাজার প্রাঙ্গণে মিলাদ, কিরাত, দোয়া মাহফিল, মেলা ও নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।

সংরক্ষণ ও সম্ভাবনা

বর্তমানে মসজিদটি স্থানীয় মাজার কমিটির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ করা গেলে এটি তাড়াশ ও চলনবিল অঞ্চলে ধর্মীয় পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

স্থানীয় ফাজিল মাদ্রাসার আরবি বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পর্যটন সুবিধা উন্নয়নের মাধ্যমে সিরাজগঞ্জের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করা সম্ভব।’