জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে শতাব্দী প্রাচীন 'গায়েবী মসজিদ': ইতিহাস ও রহস্যের নীরব সাক্ষী
জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানি ইউনিয়নে একটি গম্বুজওয়ালা প্রাচীন মসজিদ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে সময়ের গভীর সুর। মসজিদটি কে নির্মাণ করেছিলেন, তা আজও রহস্যাবৃত, তাই স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত 'গায়েবী মসজিদ' নামে।
প্রাচীন স্থাপত্য ও নির্মাণের রহস্য
এক শতাংশের কম জমির উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদের দেয়ালজুড়ে শোভা পাচ্ছে প্রাচীন নকশা, আর গম্বুজে দেখা যায় সময়ের ছাপ। দুই পাশে দুটি জানালা এবং সামনে ছোট্ট একটি দরজা—সরল গড়নে এটির গভীর সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। এটি শুধু একটি প্রার্থনালয় নয়; বরং ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা আর অদেখা কাহিনীর এক নীরব ঠিকানা।
স্থানীয়দের মতে, পঞ্চদশ শতাব্দীতে সুলতানি আমলে যমুনার তীরে আসেন কয়েকজন ধর্মপ্রচারক। তারা এখানে গড়ে তোলেন একটি খানকাহ ও মসজিদ, যা থেকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের আলো। স্থানীয় রাতুল করিম উল্লা বলেন, 'আমার দাদা ও তার আগের প্রজন্মের মানুষদের কাছে জানতে চেয়েছি—এই মসজিদ কবে নির্মিত হয়েছে, সে বিষয়ে কেউই সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। তবে ধারণা করা হয়, মসজিদটির বয়স আনুমানিক সাত থেকে আটশ' বছরের মতো হবে।'
কল্পকাহিনী ও স্থানীয় বিশ্বাস
মসজিদটি ঘিরে রয়েছে নানা কল্পকাহিনী। স্থানীয় সাজু নামে একজন ব্যক্তি জানান, 'মুরুব্বিদের কাছ থেকে শুনেছি, একসময় এই জায়গাটি ওলু মাটি ও ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল। পরবর্তীতে জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় হঠাৎ করেই একটি মসজিদের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। তখন থেকেই এর নামকরণ হয় গায়েবী মসজিদ।'
আরেক স্থানীয় হেলাল মিয়া বলেন, 'ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যেই সাহাবীরা এই স্থানটি বেছে নিয়েছিলেন এবং এই জায়গা থেকেই দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় ইসলামের প্রচার শুরু হয়। এই মসজিদের আশেপাশে দুইটি দাড়িওয়ালা সাপ ছিলো। আমরাও মাঝে মধ্যে দেখেছি। এই সাপ দুইটি কারো কোনো ক্ষতি করতো না। একটি মেরে ফেলার পরে, অন্যটিকে এখন আর দেখা যায় না।'
ধর্মীয় কার্যক্রম ও সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ
শুরুতে ইমামসহ মাত্র ২১ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতেন গায়েবী মসজিদে। সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে কাতার, বড় হয়েছে মসজিদের প্রাঙ্গণ। এখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে ভরে ওঠে এই স্থান, আর শিশুদের কোরআন তেলাওয়াতে মুখর থাকে চারদিক—যেন শত বছর পরও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যায় এখান থেকে। মুসল্লিদের দানেই চলে এখানকার সব কার্যক্রম, ভালোবাসা আর ঈমানেই টিকে আছে এই প্রাচীন প্রার্থনালয়।
মুসুল্লি আলী হোসেন বলেন, 'দূর-দূরান্ত থেকে এই মসজিদ দেখতে আসেন অনেকে। মনের আশা পূরণের জন্য করেন মানত ও দোয়া। প্রতি মাসে এই মসজিদের দান বাক্সে এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা পাওয়া যায়। সেই অর্থ দিয়েই মসজিদ পরিচালিত হয় এবং সব খরচ হয়।'
খাদেমের জীবনকাহিনী ও আধ্যাত্মিক শান্তি
মসজিদটির খাদেম হিসেবে রয়েছেন একজন ব্যক্তি, যিনি হিন্দু ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি আগে হিন্দু ছিলাম। পরে আমার পুরো পরিবার ২০১৭ সালে ইসলাম গ্রহণ করেছে। মুসলিম হওয়ার পর থেকে আমি গভীর শান্তি অনুভব করছি। এই মসজিদের খাদেম হিসেবে থাকতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি।' ইসলামের শান্তিতে তৃপ্ত এই খাদেমের পুরো জীবনটিই এখন এই মসজিদ ঘিরে আবর্তিত হয়।
মসজিদের ইমাম মো. মূসা জানান, প্রতিদিন গড়ে একশ থেকে দুইশ মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করেন। আর শুক্রবার হলে আশপাশের এলাকা ছাড়াও দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা এসে জুমার নামাজ আদায় করেন, যা এই স্থানের ধর্মীয় গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও স্থানীয় প্রত্যাশা
ইতিহাসের ভার বহন করে, রহস্যের আবরণ গায়ে মেখে আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে গায়েবী মসজিদ। স্থানীয়রা মনে করেন, যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি শুধু জামালপুর নয়, বরং পুরো ময়মনসিংহ বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নপর্যটন ও ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এই প্রাচীন স্থাপনা শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
