১০ রমজান: নবীজির (সা.) হৃদয়বিদারক দিনের স্মৃতি
ইসলামের ইতিহাসে ১০ রমজান একটি গভীর শোক ও বেদনার দিন হিসেবে চিহ্নিত। রহমতের দশকের শেষ দিনটি নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্য নিয়ে এসেছিল অপরিসীম দুঃখ ও কষ্ট। এই দিনে তিনি হারিয়েছিলেন তার সবচেয়ে কাছের মানুষ, জীবনসঙ্গিনী ও ইসলামের প্রথম অনুসারী হজরত খাদিজাতুল কুবরাকে (রা.)।
হজরত খাদিজার (রা.) জীবন ও পরিচয়
৫৫৫ খ্রিস্টাব্দে মক্কার বিখ্যাত ব্যবসায়ী পরিবারে হজরত খাদিজার (রা.) জন্ম হয়। তার পিতা খুয়াইলিদ ছিলেন মক্কার উচ্চ শিক্ষিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। মাতা ফাতিমা বিনতে যায়িদের কোল আলো করে জন্ম নেওয়া এই মহীয়সী নারী 'উম্মুল হিন্দ' উপনাম ও 'তাহিরা' উপাধিতে ভূষিত হন। মুসলিম উম্মাহর কাছে তিনি 'উম্মুল মুমিনিন' বা মুমিনদের মা হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত।
ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলী
হজরত খাদিজা (রা.) ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ তিনি দক্ষতার সাথে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। তার পিতা জীবিত থাকাবস্থায়ই তিনি পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা তৎকালীন সমাজে নারীদের জন্য বিরল ঘটনা ছিল।
নবীজির (সা.) সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠা
ব্যবসায়িক প্রতিনিধি হিসেবে নবীজি (সা.)-কে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে হজরত খাদিজার (রা.) জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। নবীজির সততা, আমানতদারিতা ও ব্যবসায়িক দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তিনি তার বিশ্বস্ত দাস মায়সারাকে সাথে দিয়ে ব্যবসায়িক সফরে প্রেরণ করেন। এই সফরে অসাধারণ সাফল্য অর্জিত হয় এবং মায়সারার বর্ণনা থেকে নবীজির চারিত্রিক মহিমা সম্পর্কে জানতে পেরে হজরত খাদিজা গভীরভাবে আকৃষ্ট হন।
বিয়ের প্রস্তাব ও দাম্পত্য জীবন
নবীজির (সা.) গুণাবলীতে মুগ্ধ হয়ে হজরত খাদিজা (রা.) নিজেই বিবাহের প্রস্তাব পাঠান। তখন তার বয়স ছিল ৪০ বছর, আর নবীজির বয়স ছিল ২৫ বছর। জাহেলি যুগের 'তাহিরা' (পবিত্রা) খাদিজার সাথে 'সাদিক' (সত্যবাদী) ও 'আল-আমিন' (বিশ্বস্ত) মুহাম্মদ (সা.)-এর বিয়ে সংঘটিত হয়। উল্লেখ্য, বিয়ের সকল ব্যয় হজরত খাদিজাই বহন করেছিলেন।
সন্তান ও পারিবারিক জীবন
নবীজির (সা.) ঔরসে হজরত খাদিজা (রা.) ছয় সন্তানের মাতা হন:
- প্রথম পুত্র কাসিম (শৈশবেই ইন্তেকাল)
- কন্যা হজরত যয়নব
- পুত্র আবদুল্লাহ (নবুয়ত পর জন্ম, শৈশবেই ইন্তেকাল)
- কন্যা রুকাইয়া
- কন্যা উম্মু কুলসুম
- কন্যা হজরত ফাতিমা (রা.)
ইসলাম গ্রহণ ও নবীজির (সা.) সহযোগিতা
নবীজি (সা.) নবুয়ত লাভের পূর্ব থেকেই হজরত খাদিজা (রা.) তার বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকাকালীন তিনি নবীজিকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করেন। প্রথম ওহি প্রাপ্তির সময় নবীজি ভয় পেলে তিনিই তাকে অভয় দিয়ে বলেন: "আপনি কারও ক্ষতি করেননি, তাই কেউ আপনার ক্ষতি করবেন না।"
ইসলামের জন্য অসামান্য অবদান
হজরত খাদিজা (রা.) ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীর সম্মান লাভ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তার সমস্ত সম্পদ ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য নবীজির (সা.) কাছে ওয়াকফ করে দেন। নবুয়ত পর নবীজি ব্যবসা-বাণিজ্য ত্যাগ করলে সংসারের আয় বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু হজরত খাদিজা ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেন।
কঠিন সময়ের সঙ্গী
ইসলামের দাওয়াত যখন মুশরিকদের কঠোর বিরোধিতার সম্মুখীন হয়, তখন হজরত খাদিজা (রা.) নবীজির প্রধান সান্ত্বনাদাত্রী হিসেবে ভূমিকা পালন করেন। তিনি নবীজির ব্যথা-বেদনা লাঘব করতে নিরলস প্রচেষ্টা চালান। নবুয়তের সপ্তম বছরে কুরাইশদের বয়কটের সময় শিয়াবে আবু তালিবে তিন বছর অন্তরীণ থাকাকালীন তিনি নিজের প্রভাব খাটিয়ে মাঝে মাঝে খাদ্যের ব্যবস্থা করতেন।
নবীজির (সা.) অকৃত্রিম ভালোবাসা
নবীজি (সা.) হজরত খাদিজাকে (রা.) আমৃত্যু ভালোবেসে গেছেন। একবার হজরত আয়েশা (রা.) নবীজিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন: "আপনি একজন বৃদ্ধার কথা মনে করে কাঁদছেন; যিনি মারা গেছেন।" উত্তরে নবীজি বলেছিলেন: "কখনো না, মানুষ যখন আমাকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে, সে তখন আমাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে। সবাই যখন কাফির ছিল সে তখন মুসলমান। কেউ যখন আমার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি, তখন সে আমাকে সাহায্য করেছে। তাঁর গর্ভেই আমার সন্তান হয়েছে।"
ইন্তেকাল ও শেষকৃত্য
নবীজির (সা.) সাথে ২৫ বছর দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করার পর নবুয়তের দশম বছরের ১০ রমজান, ৬৫ বছর বয়সে হজরত খাদিজা (রা.) মক্কায় ইন্তেকাল করেন। তখন জানাজার নামাজের বিধান না থাকায় তাকে বিনা জানাজায় মক্কার জান্নাতুল মুয়াল্লায় দাফন করা হয়। নবীজি স্বয়ং তার লাশ কবরে নামান।
ইতিহাসে স্থান
১০ রমজানের এই শোকাবহ ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে 'ইয়ামুল হুজুন' বা 'দুঃখের বছর' হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। হজরত খাদিজা (রা.) শুধু নবীজির প্রথম স্ত্রীই নন, বরং ইসলামের অগ্রযাত্রার অগ্রদূত, প্রথম মুসলিম নারী ও নবীজির জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী। তার অবদান ইসলামের ইতিহাসে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
