রমজানের ক্ষমার দশকের প্রথম তারাবিহ: সুরা হিজর ও নাহলের বিশেষ তাৎপর্য
ক্ষমার দশকের প্রথম তারাবিহ: সুরা হিজর ও নাহলের তাৎপর্য

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০ রমজান। সন্ধ্যা থেকেই শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান মাসের ক্ষমার দশক। আজ ক্ষমার দশকের প্রথম তারাবিহ নামাজ আদায় করেছেন মুসল্লিরা। হাফেজে কুরআনগণ ১১তম রোজার প্রস্তুতিতে বিশেষভাবে সুরা হিজর ও সুরা নাহল তেলাওয়াত করেছেন। এই তারাবিহতে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি তুলে ধরা হয়েছে তাঁর অফুরন্ত নেয়ামতের বর্ণনা।

ক্ষমার দশকের সূচনা ও তারাবিহর গুরুত্ব

রমজান মাসকে তিনটি দশকে বিভক্ত করা হয়—রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত। ১০ রমজান থেকে শুরু হওয়া মাগফিরাত বা ক্ষমার দশকে মুমিন বান্দারা আল্লাহর দরবারে বিশেষভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আজকের তারাবিহ এই দশকের সূচনাকে চিহ্নিত করেছে। হাফেজে কুরআনগণ তাদের তেলাওয়াতের মাধ্যমে অবিশ্বাসীদের আক্ষেপের কথা যেমন উপস্থাপন করেছেন, তেমনি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করে শেষ করা না যাওয়ার আয়াতও পাঠ করেছেন।

সুরা নাহলে আল্লাহর নেয়ামতের বর্ণনা

সুরা নাহলের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, "যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।" এই আয়াতটি আজকের তারাবিহতে বিশেষভাবে তেলাওয়াত করা হয়েছে। আল্লাহর অপরিসীম অনুগ্রহের কথা বর্ণনার পরপরই তাঁর ক্ষমাশীল ও করুণাময় হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইবনে কাসিরের তাফসিরে বলা হয়েছে, আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল—অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন, অল্প কিছুরই শাস্তি দিয়ে থাকেন।

তাবারির বর্ণনায় এসেছে, মুমিন বান্দারা যদি কোনো নেয়ামতের শোকর আদায় করতে গিয়ে ভুল করে ফেলে, তারপর তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তবে তিনি অবশ্যই ক্ষমা করে দেবেন। তাওবার পর আল্লাহ অতিশয় দয়ালু হিসেবে বিবেচিত হন।

সুরা হিজরের শিক্ষণীয় দিক

ক্ষমার দশকের প্রথম তারাবিহতে সুরা হিজরের ১ থেকে ৯৯ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়েছে। এই সুরায় মদিনার মধ্যবর্তী অঞ্চল ও সিরিয়ার নামকরা 'হিজর' এলাকার বাসিন্দাদের ধ্বংসের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। তারা ছিল আল্লাহর নাফরমান এবং তাদের মতো যারা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধিতা করে, তাদের জন্যও অশুভ পরিণতির ইঙ্গিত রয়েছে।

কাফেরদের আক্ষেপ ও পরকালীন শাস্তি

সুরা হিজরের ২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, "কাফেররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, কি চমৎকার হত! যদি তারা মুসলমান হত।" ইবনে কাসিরের মতে, কাফেররা মৃত্যুর সময় বা আখেরাতে এই আকাঙ্ক্ষা করবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, জাহান্নামবাসীরা যখন জাহান্নামে একত্রিত হবে, তখন কাফেররা আফসোস করে বলবে, হায়! আমরা যদি মুসলিম হতাম।

আল্লাহ তাআলা সুরা আনআম ও ফুরকানে একাধিক আয়াতে কাফেরদের এই আক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছেন। তারা যখন প্রকৃত অবস্থা জানতে পারবে, তখন লজ্জিত হবে এবং ইমান আনার আকাঙ্ক্ষা করবে, কিন্তু তা কোনো কাজে আসবে না।

কুরআনের সংরক্ষণ ও শয়তানের ধোঁকা

সুরা হিজরের ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, "আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।" রমজান মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে এবং আল্লাহ নিজেই এর হেফাজতের দায়িত্ব নিয়েছেন।

এছাড়া এই সুরায় রমজানে শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ আকাশকে প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান থেকে নিরাপদ করে দিয়েছেন, যাতে মানুষ শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকতে পারে।

সৃষ্টির রহস্য ও মুত্তাকিদের পুরস্কার

সুরা হিজরে মানুষ ও জ্বিনের সৃষ্টি সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ পচা কর্দম থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং জ্বিন সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে। মানুষ সৃষ্টির পর ফেরেশতাদেরকে আদম (আ.)-কে সেজদা করার নির্দেশ দেওয়া হলে ইবলিস অস্বীকার করে এবং সে দিন থেকেই মুমিনদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে আসছে।

আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে শয়তানের পথ পরিহার করে মুত্তাকিদের পথ অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। মুত্তাকিদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, যেখানে তারা নিরাপত্তা ও শান্তিতে বসবাস করবে এবং কোনো কষ্ট পাবে না।

সুরা নাহলের ব্যাপক প্রেক্ষাপট

সুরা নাহল মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং এর প্রেক্ষাপট অত্যন্ত ব্যাপক। এই সুরায় এত বেশি নিয়ামাতের কথা এসেছে যে, এটি 'সুরাতুন নিয়াম' নামেও পরিচিত। আল্লাহর গুণ-বৈশিষ্ট্য, ওহি ও পরকাল সম্পর্কে গভীর আলোচনা করা হয়েছে।

এই সুরায় হালাল-হারাম, হিজরত, নির্যাতন ও ইমান ত্যাগের চেষ্টার মতো বিষয়াবলীও আলোচিত হয়েছে। সর্বোপরি, গোটা মানবজীবন, পরকালীন জীবন ও অদৃশ্য জগতের প্রভাব এই সুরার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ক্ষমার দশকের বিশেষ মাহাত্ম্য

রমজানের ক্ষমার দশক মুমিন বান্দাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দশকে তাওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। আজকের তারাবিহতে সুরা হিজর ও নাহলের তেলাওয়াত মুমিনদের জন্য শিক্ষণীয় দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। আল্লাহর অগণিত নেয়ামতের শোকর আদায় এবং তাঁর ক্ষমাশীলতার প্রতি বিশ্বাস রাখাই এই দশকের মূল উদ্দেশ্য।

রমজানের বাকি দিনগুলোতেও মুসল্লিরা বিশেষভাবে কুরআন তেলাওয়াত, তারাবিহ নামাজ ও ইবাদত-বন্দেগিতে মগ্ন থাকবেন। ক্ষমার দশক শেষে নাজাতের দশক শুরু হবে, যা মুমিনদের জন্য চূড়ান্ত মুক্তির সুযোগ নিয়ে আসবে।