শিশুদের রোজা ও শৈশবের গুরুত্ব: পবিত্র রমজানে নেক সন্তান গড়ার দিকনির্দেশনা
শিশুদের রোজা ও শৈশবের গুরুত্ব: নেক সন্তান গড়ার দিকনির্দেশনা

শিশুদের রোজা ও শৈশবের গুরুত্ব: পবিত্র রমজানে নেক সন্তান গড়ার দিকনির্দেশনা

পবিত্র রমজান মাসে শিশুরা অত্যন্ত উৎসুকতার সঙ্গে চাঁদ ওঠার অপেক্ষায় থাকে। তারা বড়দের সাথে সাহরি, ইফতার ও তারাবিহ নামাজে অংশগ্রহণ করে প্রাণচঞ্চল ও আনন্দের মাধ্যমে। শিশুরা রোজা পালন করে আগ্রহ ও দৃঢ়তার সাথে, যা তাদের চরিত্র গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে, শিশুরা পবিত্র, মাসুম বা নিষ্পাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। নাবালেগ শিশুদের নামাজ, রোজা ও অন্যান্য আমলের সওয়াব পিতা-মাতা ও অভিভাবকরা লাভ করেন। নাবালেগ শিশু রোজা রেখে ভেঙে ফেললে তার জন্য কাজা বা কাফফারা কিছুই প্রযোজ্য হবে না।

শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সময়সীমা

সাধারণত মেয়েরা ১১ থেকে ১৩ বছর বয়সে এবং ছেলেরা ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সে বালেগ বা সাবালক হয়। এই বয়স থেকে তাদের জন্য নামাজ, রোজা ইত্যাদি ফরজ হয়ে যায়। তবে ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, ৭ বছর বয়স থেকে শিশুদের ধর্মীয় বিষয় শিখানো শুরু করা উচিত এবং ১০ বছর বয়স থেকে বাস্তব প্রশিক্ষণমূলক আমল করানো প্রয়োজন। নামাজ ও রোজা রাখার অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে শিশুরা নেক ও আমলদার মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। সন্তান লালনপালনে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে নানা নির্দেশনা রয়েছে, যা পিতামাতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শৈশব রক্ষা ও সভ্যতার উন্নয়নে ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গি

কোনো জাতি ধ্বংস হওয়ার আগে তাদের সন্তানদের শৈশব ধ্বংস হয়ে যায়। হজরত নুহ (আ.) বলেছিলেন, ‘হে আমার রব! পৃথিবীতে অকৃতজ্ঞদের একটি গৃহও রেখো না। যদি তুমি তাদের ছেড়ে দাও, তবে তারা তোমার বান্দাদের বিপথগামী করবে; এবং তারা অপরাধী ও পাপী সন্তানই জন্ম দেবে।’ (সুরা-৭১ নুহ, আয়াত: ২৬-২৭) তারা পাপী ও বিপথগামী হলেও যদি তাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকত, তবে সে জাতি সমূলে ধ্বংস হওয়া থেকে বেঁচে যেত। তাই আমাদের মানবসভ্যতা রক্ষার জন্য শিশুদের শৈশবকে পঙ্কিলতা ও আবিলতামুক্ত রাখতে হবে। সভ্যতার উন্নয়নের জন্য আমাদের শিশুদের উন্নত চিন্তা ও পবিত্র জীবনের দীক্ষা দিতে হবে।

শিশুদের ভবিষ্যৎ গঠনে ইসলামিক প্রার্থনা ও নির্দেশনা

মানুষের জীবনের গতিপথ শৈশবেই নির্ধারিত হয়। সন্তানের শৈশব সুন্দর হলে সে ইহকাল ও পরকালে গর্বের ধন হবে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা এমন নারীদের বিয়ে করো, যারা অধিক সন্তানপ্রিয়। আমি তোমাদের সুসন্তানের জন্য রোজ কিয়ামতে গর্বিত হব।’ (নাসায়ী: ৩২২৭, আবুদাউদ: ২০৫০) আল্লাহ-তাআলা অনাগত সন্তানের জন্য দোয়া ও শুভকামনা শিখিয়েছেন, ‘হে আমার প্রভু! আমাকে সুসন্তান দান করুন।’ (সুরা-৩৭ ছফফাত, আয়াত: ১০০) ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের উভয়কে আপনার অনুগত করুন আর আমাদের বংশধরদিগকেও আপনার অনুগত করুন; আপনার বিধান আমাদের প্রত্যক্ষ করান এবং আমাদের প্রতি মনোনিবেশ করুন! নিশ্চয় আপনি তওবা কবুলকারী ও দয়ালু।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১২৮)

পারিবারিক পরিবেশ ও অভিভাবকের দায়িত্ব

সন্তান যেন বার্ধক্যে পিতা-মাতাকে নিঃসঙ্গ ফেলে না রাখে, সে জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে, ‘হে আমার প্রভু! আমাকে একা ছেড়ে দেবেন না, আপনিই তো সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী দাতা।’ (সুরা-২১ আম্বিয়া, আয়াত: ৮৯) সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজন উত্তম পারিবারিক পরিবেশ। কোরআন করিমের ভাষায়, ‘হে আমার প্রভু! আমাকে উত্তম পরিবার দান করুন, নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ৩৮) কোনো শিশু যদি অভিভাবকের অবহেলার কারণে পথচ্যুত হয়ে যায়, তাহলে সে হাশরের দিনে আল্লাহর কাছে অভিভাবকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে, ‘হে আমাদের রব! আমরা আমাদের অভিভাবক ও বড়দের অনুসরণ করেছি, তারা আমাদের বিপথগামী করেছে। হে আমাদের প্রভু! আপনি তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং মহা অভিসম্পাত করুন।’ (সুরা-৩৩ আহযাব, আয়াত: ৬৭-৬৮) তারা আরও বলবে, ‘হে আমাদের প্রভু! যে সকল জিন ও ইনসান আমাদের বিপথগামী করেছে, তাদের আমাদের সামনে আনয়ন করুন। আমরা তাদের আমাদের পদতলে পিষ্ট করব, যাতে তারা লাঞ্ছিত-অপমানিত হয়।’ (সুরা-৪১ হা-মীম সাজদাহ, আয়াত: ২৯)

লেখক: অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।