রমজানে স্বপ্নদোষ: রোজার উপর প্রভাব ও ইসলামী বিধান
রমজান মাসে রোজা পালনকারী অনেক মুসলিমের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন উঁকি দেয়—দিনের বেলা ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ হলে কি রোজা ভেঙে যায়? ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এই বিষয়টির স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বিধান রয়েছে, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য পথনির্দেশক ভূমিকা পালন করে।
স্বপ্নদোষ হলে করণীয় কী?
রোজা অবস্থায় যদি কোনো ব্যক্তি দিনের বেলা ঘুমের মধ্যে যৌন সম্পর্কের স্বপ্ন দেখে এবং বীর্যপাত হয়, অথবা কোনো স্বপ্ন স্পষ্টভাবে মনে না থাকলেও ঘুম থেকে উঠে শরীর বা পোশাকে বীর্যের চিহ্ন দেখতে পায়, তাহলে অন্যান্য সময়ের মতোই তার উপর গোসল ফরজ হবে। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, যত দ্রুত সম্ভব পবিত্রতার জন্য গোসল করে নেওয়া উচিত, বিশেষ করে নামাজ আদায়ের পূর্বে এই গোসল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: স্বপ্নদোষের পর গোসল ফরজ হলেও এটি রোজার সাথে সরাসরি সংযুক্ত নয়; বরং এটি পবিত্রতা অর্জনের একটি মাধ্যম।
এতে কি রোজা নষ্ট হয়?
না, রোজা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে রোজা ভেঙে যায় না এবং রোজার কোনো প্রকার ক্ষতিও হয় না। এর প্রধান কারণ হলো, স্বপ্নদোষ সম্পূর্ণরূপে মানুষের ইচ্ছা বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঘটে থাকে। এটি একটি অনিচ্ছাকৃত ও স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া, যা মানুষের সচেতন সিদ্ধান্তের ফল নয়।
প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই মাঝে মাঝে স্বপ্নদোষ হওয়া একটি স্বাভাবিক শারীরিক বিষয়। সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালে এই ঘটনা বেশি পরিলক্ষিত হয়, তবে পরবর্তী বয়সেও এটি ঘটতে পারে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এতে কোনো গুনাহ নেই, কারণ ঘুমন্ত অবস্থায় সংঘটিত বিষয়ের উপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
কুরআনের দলিল
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন: لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَا অর্থাৎ 'আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।' (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৮৬)। এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিষয়গুলোর জন্য আল্লাহ তাআলা দায়িত্বারোপ করেন না।
হাদিসের দলিল
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ অর্থাৎ 'তিন ব্যক্তির কাছ থেকে (গুনাহ লেখার) কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে—১. ঘুমন্ত ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়; ২. মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে সুস্থ হয়; ৩. অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু, যতক্ষণ না সে বালেগ হয়।' (আবু দাউদ ৪৪০৩)। এই হাদিসটি ঘুমন্ত অবস্থায় সংঘটিত কাজের জন্য দায়মুক্তির স্পষ্ট প্রমাণ প্রদান করে।
সংক্ষেপে ইসলামী বিধান
- স্বপ্নদোষ হলে গোসল ফরজ হয়, যা পবিত্রতা অর্জনের জন্য অত্যাবশ্যক।
- এতে রোজা ভাঙে না বা রোজার কোনো ক্ষতি হয় না।
- এটি কোনো গুনাহের কাজ নয়, কারণ এটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত ঘটনা।
অতএব, রমজান মাসে রোজা অবস্থায় স্বপ্নদোষ নিয়ে অহেতুক দুশ্চিন্তা বা ভয়ের কোনো কারণ নেই। বরং দ্রুত পবিত্রতা অর্জন করে ইবাদত-বন্দেগিতে মনোনিবেশ করাই মুমিনের কর্তব্য। ইসলামের এই সুস্পষ্ট বিধান মুসলিমদের জন্য স্বস্তি ও নির্দেশনা বয়ে আনে, যাতে তারা শান্তি ও আত্মবিশ্বাসের সাথে রোজা পালন করতে পারে।
