ইমাম আশআরি: সুন্নি চিন্তাধারার পথিকৃৎ ও তাঁর কালাম শাস্ত্রের অবদান
ইমাম আশআরি: সুন্নি চিন্তাধারার পথিকৃৎ

ইমাম আশআরি: সুন্নি চিন্তাধারার পথিকৃৎ ও তাঁর কালাম শাস্ত্রের অবদান

ইমাম আবুল হাসান আশআরি (রহ.)-কে সুন্নি মূলধারার চিন্তাধারার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর আকিদাগত পদ্ধতি মূলত সেই চিন্তারই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, যার দিকে ইসলাম আহ্বান জানিয়েছে। আশআরি চিন্তাধারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সেই ধারারই একটি সম্প্রসারণ, যা ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক ইবনে আনাস, ইমাম শাফেয়ি এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলসহ সুন্নি ধারার মহান ইমামগণ এবং অন্যান্য মনীষীদের আনুষ্ঠানিক ধারা হিসেবে স্বীকৃত ছিল এবং এখনও রয়েছে।

জীবন ও শিক্ষার স্তর

আশআরি চিন্তাধারা তার প্রতিষ্ঠাতা আলী বিন ইসমাইল ইবনে বিশর ইবনে ইসহাক ইবনে সালিম ইবনে ইসমাইল ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে বিলাল ইবনে বুরদাহ ইবনে মুসা আশআরির দিকে সম্পৃক্ত করা হয়। তাঁর উপনাম আবু হাসান এবং উপাধি ‘নাসিরুদ্দিন’। তিনি ২৬০ হিজরি নাগাদ ইরাকের বসরায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ৩২৪ হিজরিতে বাগদাদে ইন্তেকাল করেন। সেখানেই সারাজীবন জ্ঞান সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন।

গবেষকরা ইমাম আশআরির জীবনকে তিনটি প্রধান স্তরে ভাগ করেন। প্রথম স্তরে, জন্ম থেকে দশ বছর বয়স পর্যন্ত, তিনি বাবা ও শিক্ষকদের কাছে সুন্নি মতাদর্শে প্রাথমিক শিক্ষা নেন। দ্বিতীয় স্তরে, তিনি মুতাজিলা দর্শনের অন্যতম স্তম্ভ আবু আলি আল-জুব্বায়ির সাহচর্য গ্রহণ করেন এবং মুতাজিলা মতবাদে ইমামের মর্যাদা লাভ করেন। তবে মুতাজিলা শিক্ষকদের সঙ্গে তাঁর বিতর্ক থেকে স্পষ্ট হয় যে তিনি তাদের পদ্ধতিতে পুরোপুরি তুষ্ট ছিলেন না।

মুতাজিলা মতবাদ ত্যাগ ও সুন্নিতে প্রত্যাবর্তন

তৃতীয় স্তর শুরু হয় মুতাজিলা মতবাদ ত্যাগের মাধ্যমে। জীবনীকাররা বলেন, ৩০০ হিজরি নাগাদ রমজান মাসে তিনি স্বপ্নে আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে দেখেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার সুন্নাহর অনুসরণ করো।’ এ স্বপ্ন পরপর তিনবার দেখার পর তিনি ১৫ দিন লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে চিন্তাভাবনা পুনর্গঠন করেন। এরপর বসরার জামে মসজিদে মিম্বরে উঠে ঘোষণা করেন, তিনি পূর্ববর্তী বিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়েছেন—যেমন শরীর থেকে কাপড় খুলে ফেলা হয়।

ইমাম আশআরি এমন এক সময়ে আবির্ভূত হন যখন বিভিন্ন বেদআতি ফেরকা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। তিনি কোরআন, সুন্নাহ ও ইজমার অনুসারী ছিলেন এবং যৌক্তিক ও শ্রুতিগত দলিলের সুন্দর সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। কাজি আইয়াজ বলেন, তিনি আহলুস সুন্নাহর পক্ষে বহু কিতাব লিখেছেন এবং মুতাজিলা ও বেদআতিরা আল্লাহর গুণাবলি, দর্শন, কালাম ও পরকালের শাফায়াত নিয়ে যে ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়েছিল, তিনি সেগুলোর প্রমাণসমৃদ্ধ জবাব দিয়েছেন।

আশআরি চিন্তাধারার মূলনীতি ও প্রভাব

আশআরি আকলকে অসীম মূল্য দিলেও একে ওহির অধীনস্থ মনে করতেন। তিনি আল্লাহর গুণাবলি প্রসঙ্গে মুতাজিলাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি ইলম (জ্ঞান), কুদরত (ক্ষমতা) ও হায়াত (জীবন)-কে আল্লাহর সত্তার সঙ্গে কায়েম (প্রতিষ্ঠিত) হিসেবে গ্রহণ করেন। আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলির সম্পর্কে তিনি বলেন, আল্লাহর গুণাবলি সত্তা নয়, আবার সত্তা থেকে ভিন্ন কিছুও নয়। তিনি মুতাজিলাদের গুণাবলি অস্বীকারের সমালোচনা করে আল-ইবানা গ্রন্থে বলেন, যদি আল্লাহ ‘মুরিদ’ (ইচ্ছাকারী) হন, তবে তাঁর ‘ইরাদা’ (ইচ্ছা) থাকা আবশ্যিক। ইরাদা ছাড়া মুরিদ হওয়া অসম্ভব।

মু‘তাজিলাদের ‘খলকুল কুরআন’ (কোরআন সৃষ্ট) মতবাদ প্রত্যাখ্যান করে তিনি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের পথ অনুসরণ করেন। তাঁর মতে, কালামের দু’টি স্তর: ১. কালামে নাফসি, ২. কালামে লাফজি (লিখিত কালাম)। কালামে নাফসি আল্লাহর সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত অনাদি কালাম। লিখিত কালাম অক্ষর ও শব্দ দিয়ে গঠিত যা আমরা পাঠ করি এবং তা সৃষ্ট। তিনি যুক্তি দেন, যেমন আল্লাহর ‘ইলম’ এক হলেও তা অগণিত বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত, তেমনি তাঁর ‘কালাম’ এক হলেও তা আদেশ, নিষেধ ও সংবাদ হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন রূপ পায়।

গ্রন্থসমূহ ও স্থায়ী প্রভাব

ইমাম ইবনে ফুরাকের মতে তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ৯০টিরও বেশি। উল্লেখযোগ্য কিতাবসমূহের মধ্যে রয়েছে:

  • মাকালাতুল ইসলামিয়িন: বিভিন্ন ফিরকার আকিদা বর্ণনার প্রাচীনতম গ্রন্থ, যেখানে তিনি অত্যন্ত আমানতদারির সঙ্গে সবার মত উল্লেখ করেছেন।
  • আল-লুম‘আ: যুক্তি ও ওহীর সমন্বয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে সুন্নি আকিদার উপস্থাপনা। অনেক গবেষক একে আল-ইবানার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
  • রিসালাতু ইলা আহলিস সাগার: সীমান্তবর্তী আলেমদের প্রশ্নের উত্তরে লিখিত একান্নটি মৌলিক বিশ্বাসের সমষ্টি, যা সালাফের ঐকমত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
  • আল-ইবানা আন উসুলিদ দিয়ানা: সালাফদের পদ্ধতিতে লেখা, যেখানে তিনি আল্লাহর সিফাতগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহর ওপর সোপর্দ করার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
  • রিসালাতু ইস্তিহসানুল খাওয ফি ইলমিল কালাম: এতে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, দ্বীনের প্রয়োজনে যুক্তিবিদ্যার চর্চা জায়েজ। তিনি সুরা আম্বিয়ার ২২ নম্বর আয়াত দিয়ে এর প্রমাণ পেশ করেছেন।

ইমাম আশআরির এই মধ্যপন্থী পদ্ধতি শাফেয়ি ও মালেকি ফিকহ এবং ইমাম জোনায়েদ বাগদাদির সুন্নি তাসাউফের সাথে মিশে এক ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামি জীবনদর্শন তৈরি করেছে। আজ বিশ্বের অধিকাংশ সুন্নি মুসলিম তাঁর এই দর্শনের অনুসারী। মাকরিজি বলেন, আশআরি চিন্তাধারা মুসলিম দেশগুলোতে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে অন্য সব চিন্তাধারা মানুষ ভুলে গেছে এবং আজ শুধু হাম্বলিদের একটি অংশ ছাড়া বাকি সবাই আশআরি মতের অনুসারী।

পরিশেষে বলা যায়, ইমাম আবুল হাসান আশআরির অবদান হলো, তিনি আকিদার বিষয়গুলোকে যুক্তিবিদ্যার ফ্রেমে সাজিয়েছেন যাতে বিরোধীদের বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবেলা করা যায়। তাঁর চিন্তাধারা সুন্নি পথে ইসলামি আকিদাকে সুরক্ষিত রাখতে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে এবং তা আজও প্রাসঙ্গিক হিসেবে বিবেচিত হয়।