রক্ত জুস আর অভিশপ্ত ঘর: তাশি থাকালির রহস্যময় কাহিনি
তাশি থাকালি দুহাত দিয়ে সন্দীপ থাপা এবং তামাং শেরপাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের ঘরের দিকে টেনে নিয়ে চললেন। বয়সের ভার সত্ত্বেও তাঁর হাঁটার গতি ছিল অত্যন্ত দ্রুত। দুজন তরুণ অভিযাত্রী তাঁর সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠল। তাদের মনে হচ্ছিল, তারা যেন প্রবল শক্তিশালী কোনো ব্যক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটছে। তাছাড়া বয়স্ক হলেও তাশি থাকালির হাঁটার গতি তরুণদের মতোই দাপটে। তার হাতের চাপ এতই শক্তিশালী যে, দুজন চাইলেও হাত ছাড়াতে পারছে না।
হাঁটতে হাঁটতে তাশি থাকালি বলতে শুরু করলেন, 'এই যে ঘরটা দেখছো, এটা একজন তান্ত্রিকের ঘর। তান্ত্রিক ছিল আমার ছোটোবেলার বন্ধু। নাম—নাওয়াং গোম্বু। ছোটোবেলায় আমরা একসঙ্গে খেলতাম, গল্প করতাম। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে তন্ত্রমন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ল। তখন থেকেই আমাদের সম্পর্ক ফাটল ধরতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত মতানৈক্য তৈরি হলো, আর আমরা দুজন দুই মেরুতে চলে গেলাম। তার ক্ষমতা ছিল প্রচণ্ড, তন্ত্রমন্ত্রের জোরে সে যে কোনো মানুষের চেহারা ধারণ করতে পারত। তোমরা তো নিজ চোখেই দেখেছ সব, কেমন করে সে অন্য কারো রূপে হাজির হতে পারে। স্বয়ং আমার রূপ ধারণ করেই তোমাদের ধোঁকা দিতে চেয়েছে। একবার সে নেপাল রাজার সভাসদের একজনের রূপ ধারণ করে পুরো রাজপ্রাসাদের লোকজনকে ধোঁকা দিয়েছিল। সবাই ভেবেছিল, সত্যিই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই ব্যক্তি। পরে যখন আসল সত্য প্রকাশ পেল, তখন চারদিকে হইচই পড়ে গেল। তাও সেই ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় আশি বছর আগের।'
'আশি বছর মানে! দাই, তুমি কি রূপকথার গল্প শুনাচ্ছ আমাদের? নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে তোমার।' অবাক হয়ে জানতে চাইলেন সন্দীপ থাপা। তাশি থাকালি দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, 'তোমরা হয়তো বিশ্বাস করবে না। জানো, আমার বর্তমান বয়স কত? আমি এখন একশ সত্তর বছরের মানুষ।' তামাং শেরপা বিস্ময়ে সঙ্গে বলল, 'কি বলছো দাই! এ তো অসম্ভব! পৃথিবীতে এত বয়সের কেউ বেঁচে আছে বলে আমি কখনো শুনিনি। তুমি কি আমাদের সঙ্গে মজা করছো?' তাশি থাকালি উত্তর দিলেন, 'না, মজা করছি না। বিশ্বাস না হলে আমার চুল বা নখ নিয়ে পরীক্ষা করে দেখো। তখনই বুঝবে আমি মিথ্যে নাকি সত্য বলছি।'
সন্দীপ থাপা বিস্ময়ে থমকে দাঁড়াল। তার চোখ বড় হয়ে উঠল। 'আশি বছর আগে...! সে এখনো বেঁচে আছে!' তাশি থাকালি বললেন, 'তান্ত্রিক এখন আর বেঁচে নেই। সে যদিও অনেক আগেই মরে গেছে। তবে মন্ত্রের শক্তিতে তার আত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই মন্ত্রের ক্ষমতায় তাকে তোমরা আমার মতো রূপ ধারণ করতে দেখেছ। কারণ সে বেঁচে থাকাকালীন আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জন করতে পেরেছিল।' তামাং শেরপা ভয়ে ভয়ে বলল, 'তাহলে আমরা যে ঘরে ঢুকেছিলাম, সেটা কী আসলেই ঘর?' তাশি থাকালি মাথা নেড়ে বললেন, 'ওটা ঘর। এখানে তান্ত্রিক নিজেই থাকতো। ঘরটা অভিশপ্ত। যারা এ ঘরে একবার ঢুকে, তারা সহজেই ফিরে আসতে পারে না। তোমরা ভাগ্যবান যে, আমি সময়মতো পৌঁছলাম। সামান্য দেরি হলে আর তোমাদের উদ্ধার করা সম্ভব হতো না। চিরদিনের জন্য তান্ত্রিকের পাহারাদার হয়ে থাকতে। যেমনটা অন্যরা এখন তান্ত্রিকের গোলামি করছে।'
কথা বলতে বলতে তিনজন দ্রুত তাশি থাকালির ঘরে পৌঁছল। ঘরে প্রবেশ করেও তাশি থাকালি কথা থামায়নি। বলেই যাচ্ছেন, 'এই পর্বত শুধু বরফ আর পাথরের নয়, এখানে দেবতা, তান্ত্রিক অনেক কিছুই আছে। অনেক রহস্যও লুকিয়ে আছে এই পর্বতে। তোমরা আজ তার সামান্য নমুনা দেখলে।' কথাটা বলেই বৃদ্ধ তাশি থাকালি সবার দিকে তাকালেন। তার কথার আসল অর্থ বুঝতে পারল শুধু সন্দীপ থাপা আর তামাং শেরপা। কারণ ঘটনাটা তাদের সঙ্গেই ঘটেছিল, তারাই জানে বিস্তারিত। দলের অন্যরা কিছুই বুঝতে পারল না। তারা শুধু হতবাক হয়ে তাশি থাকালির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে দলের ভেতর অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল। কেউ কিছু বলতেও পারছিল না। মাহির প্রচণ্ড বিরক্ত হলেন, ধৈর্য রাখতে পারলেন না আর। রেগে বললেন, 'তাশি দাই, তোমার এই মিষ্টি গল্প শুনতে ভালো লাগছে না। আমরা অনেকক্ষণ ধরে হেঁটেছি, সবাই ক্লান্ত। তুমি কি আসলেই খাবারের ব্যবস্থা করেছ? না কি শুধু গল্প শুনিয়েই সময় কাটিয়ে দেবে?' তাশি থাকালি শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, 'বলেছি তো, যথাসময়ে খাবার পাবে।' একই জবাব বারবার শুনে মাহির আরও রেগে গেলেন, 'সন্ধ্যা থেকে একই কথা বলে যাচ্ছ। তোমার সেই যথাসময় কখন হবে? আমরা ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছি, বুঝতে পারছ না।' 'আগে জুসটা খাও। ভালো লাগবে, শরীরে শক্তি ফিরে পাবে।' মাহির অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় জুস?' 'বাইরে ট্রে রেখে এসেছি। তোমাদের বলতে ভুলে গেছি, জুস রেখেই তো আমি দৌড়ে গিয়েছিলাম এই দুজনকে উদ্ধার করতে।' মাহির জিজ্ঞেস করলেন, 'উদ্ধার মানে কী?'
সন্দীপ থাপা এবার ধীরে ধীরে পুরো ঘটনাটা খুলে বলতে শুরু করলেন। সবাই মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছিল। ঠিক সেই সময় তাশি থাকালি বাইরে গিয়ে কাঠের ট্রে হাতে নিয়ে আবার ঘরে ঢুকলেন। ট্রের ওপর সাজানো গ্লাসে রয়েছে লালচে রঙের জুস। তিনি একে একে সবার হাতে গ্লাস তুলে দিলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, 'রাতের খাবার আসছে কিছুক্ষণের মধ্যেই। আগে জুস খেয়ে নাও।' গ্লাসের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল নোনতা গন্ধ। সেই গন্ধে বিভোর হয়ে উঠল সবাই; মাদকতার মতো লাগছে। সবার জিভে জল এসে গেল সঙ্গে সঙ্গেই। তারা তখন প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত, তাই দেরি না করে সবাই ঢকঢক করে জুস পান করল।
জুস খাওয়া শেষ হতেই তাশি থাকালি ট্রে নামিয়ে রাখলেন। এবার তিনি তাদের সামনে শুকনো মাংসের টুকরো আর কিছু সবজি সাজিয়ে দিয়ে বললেন, 'দ্রুত খেয়ে ফেল।' জুস খেয়েই মাহিরের কপালে ভাঁজ পড়ে গেল। তিনি বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তাশি দাই, সত্যি বলো, এটা কীসের জুস খাইয়েছ? রক্তের মতো নোনতা স্বাদ পাচ্ছি।' তাশি থাকালি স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দিলেন, 'ঠিকই ধরেছ। এটা দেবতার আশীর্বাদ। যে খাবে, তার শরীরে শক্তি বাড়বে। ভয় পেয়ো না, এটা মানুষের রক্ত নয়, পশুর রক্ত। দেখবে শরীরে প্রচুর শক্তি অর্জন হবে।' 'রক্ত' শব্দটা শুনেই কয়েক জনের মুখ বিকৃত হয়ে গেল, কেউ আবার বমি করার মতো শব্দ করতে লাগল। ভয়ের সঙ্গে ঘৃণার মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ল দলের মাঝে।
মাহির আর নিলেশ এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন যে, তারা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। দুজন একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে বৃদ্ধের গলা টিপে ধরতে চাইছিলেন। আর তাদের চোখে-মুখে ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে সন্দীপ থাপা দ্রুত এগিয়ে এসে দুজনকে থামিয়ে দিলেন। কারণ তিনি জানেন, এই বৃদ্ধ সাধারণ মানুষ নন। তার ভেতরে লুকিয়ে আছে অদ্ভুত শক্তি। তাই তিনি সবাইকে সতর্ক করে বললেন, 'শান্ত হও। উত্তেজিত হয়ো না। যদি এখন কিছু করো, সবাই বিপদে পড়বে। ঘটনার বিস্তারিত পরে জানাব।'
রক্ত জুস পান করার পর পরই তাদের শরীরে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দিলো। মুহূর্তের মধ্যে ক্লান্তি উধাও হয়ে গেল। হাত-পা শক্তিশালী হয়ে উঠল, যেন হঠাৎ করে একটা শক্তি তাদের ভেতরে প্রবেশ করেছে। শক্তি সঞ্চয়ের সঙ্গে সঙ্গে মাথাটাও ভারী হয়ে এলো। মনে হলো কেউ অদৃশ্যভাবে তাদের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে লাগল। ঠিক এই অবস্থায় বাইরে থেকে ভেসে এলো এক বিকট শব্দ। কখনো মনে হলো কোনো পশু ভয়ংকর গর্জন করছে, আবার কখনো মনে হলো মানুষের মতো কেউ চিৎকার করছে। শব্দগুলো এত অস্বাভাবিক আর বিভ্রান্তিকর ছিল যে, কেউই বুঝতে পারল না আসলে কীসের শব্দ।
তাশি থাকালি চোখ বন্ধ করতে করতে বললেন, 'আজ রাত খুব কঠিন একটা রাত। এই রাত পার করা অত সহজ নয়। এই ঘরের আশেপাশে কিছু ভয়ানক আত্মা ঘোরাফেরা করছে। ওরা অচেনা মানুষকে সহ্য করতেই পারে না। তোমরা আমার ঘরে আছো, ওরা সেটা জেনে গেছে।' তাঁর কথা শেষ হতেই দরজার বাইরে আঁচড়ের শব্দ শোনা গেল। শব্দটা এতই তীব্র ছিল যে, দলের সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। তারা বুঝতে পারল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে ঘরটাকে ঘিরে।
রাত যত গভীর হতে লাগল, ততই অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল। প্রথমে দেখা গেল ঘরের কাঠের দেওয়ালে উপর একজোড়া জানোয়ারের চোখ জ্বলজ্বল করে জ্বলছে; অনেকটাই আগুনের শিখার মতো। তার ওপর শুনতে পেল, কেউ খুব কাছে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে অচেনা ভাষায় কথা বলছে। অথচ চারদিকে তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেল না তারা। সবাই চুপ করে রইল। কারো সাহস হলো না আর নড়েচড়ে বসারও। এদিকে আবার প্রদীপের আলোটাও অস্বাভাবিকভাবে কাঁপতে লাগল। সেদিকে নজর পড়তেই ভয়ে দলের সবার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো। আর মাহির নির্লিপ্ত হয়ে তাকিয়ে রইলেন প্রদীপের দিকে।
তাশি থাকালি শান্তভাবে মন্ত্র পড়তে লাগলেন। তার কণ্ঠস্বর ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করে ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এদিকে সবাই ভয়ে ভয়ে জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ জোড়া বিভিন্ন আকার আকৃতি ধারণ করে দেওয়ালের উপর নড়ছে। এরই ফাঁকে নিলেশ জানালার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, দূর পর্বতের ঢালে কয়েকটা আগুনের শিখা জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। অনেকটাই মশাল হাতে ঘুরে বেড়ানোর মতো। আগুন একবার কাছে আসছে, আবার দূরে সরে যাচ্ছে। নিলেশ দ্রুত মাহিরকে দেখালেন। তা দেখেই মাহিরের চোখ কপালে উঠল।
তাশি থাকালিও সেটা লক্ষ্য করলেন। তাঁর চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্ন নেই, তিনি বললেন, 'এরা পাপাত্মা। সাধারণত অমাবস্যার রাতে বের হয়। আজ অমাবস্যা নয়, তবু ওরা বের হয়েছে শিকারের খোঁজে। তোমাদের নিয়ে যেতে ওরা অস্থির হয়ে উঠেছে।' কথার মাঝেই দরজায় জোরে ধাক্কা পড়ল। মাহিরের হৃৎপিণ্ডের ধড়ফড়ানি আরও বেড়ে গেল। তাশি থাকালি উঠে দরজা খুললেন। বাইরে কেউ নেই। শুধু দেখা গেল পাথরের ওপর লাল রঙের এক অদ্ভুত চিহ্ন আঁকা। চিহ্নটা তাজা রক্ত দিয়ে আঁকা—এটা বুঝতে কারও সময় লাগল না। বাতাসে এক ধরনের পচা গন্ধ ভেসে আসছে। সবাই নিশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল রক্তের চিহ্নের দিকে।
রক্তের চিহ্নটা নিলেশ হাত বাড়িয়ে ছুঁতে যাচ্ছিলেন। তখনই তাশি থাকালি তার হাতের কবজি শক্ত করে চেপে ধরলেন। তিনি বললেন, 'এটা ছোঁবে না। অভিশাপের চিহ্ন। যে ছোঁবে, সে আর স্বাভাবিক মানুষ থাকবে না। পশুর আকৃতি ধারণ করবে। আর তখন ওরা সহজেই প্রাণ কেড়ে নিতে পারবে।' নিলেশ হাত সরিয়ে নিলেন। সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। প্রদীপের আলো কাঁপতে কাঁপতে নিভে গেল। চারপাশে অন্ধকার নেমে এলো। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না; এমনকি টর্চও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এমনি সময় বাহির থেকে এক অচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, 'তোমরা এখানে কেন এসেছ?' কণ্ঠস্বরটা ঘরের ভেতরে প্রতিধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়তেই দলের সবাই ভয়ে কাঁপতে লাগল। তাদের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো। নিলেশ সাহস করে উত্তর দিলেন, 'আমরা শুধু আশ্রয় নিতে এসেছি। কারো ক্ষতি করতে আসিনি। তোমরা কেন আমাদের ভয় দেখাচ্ছ?' কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এলো, এবার আরও গম্ভীর, 'আশ্রয় নিতে হলে মূল্য দিতে হয়। বুড়ো তোমাদের সেটা জানায়নি...' সবাই চুপ। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধু অনুভূত হচ্ছে চারপাশে অদৃশ্য কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর বাইরে তখন পর্বতের ঢালে আগুনের শিখাগুলো নড়তে শুরু করল।
তাশি থাকালি বললেন, 'এরা শুধু ভয় দেখাচ্ছে না। এরা মূল্য চাইছে, হয়তো রক্ত, নয়তো আত্মা। তোমাদের মধ্যে কাউকে তারা বেছে নেবে।' মাহির আতঙ্কে কেঁপে উঠলেন। মাহির বললেন, 'আমরা কীভাবে জানব, তারা কী চাইছে?' আবারও দরজার বাইরে থেকে শব্দ ভেসে এলো। এবার শব্দটা আরও তীব্র। 'মূল্য দাও...না হলে তোমাদের সবাইকে নিয়ে যাব।' তাশি থাকালি মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন। তার কণ্ঠস্বর ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল। এভাবে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত তিনি একটানা মন্ত্র জপ করতে থাকলেন। একসময় বাইরের পরিবেশ শান্ত হয়ে এলো—আঁচড়ের শব্দ থেমে গেল, আর অচেনা কণ্ঠস্বরও মিলিয়ে গেল।
তাশি থাকালি মন্ত্রপাঠ থামিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, 'তোমাদের একটা সত্য জানানো দরকার। শোনো, বহু বছর আগে এই পর্বতে এক দেবতার পূজা হতো। সেই দেবতা ছিল রক্তপিপাসু। তার অনুচরেরা আজও এখানে ঘুরে বেড়ায়। ওরা বিশ্বাস করে, যদি আবার পূজা শুরু হয়, তবে দেবতা পুনরায় জেগে উঠবে। তাই ওরা বলি খুঁজে বেড়ায়। কেউ যদি এখানে রাত কাটায়, তখনই ওরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। যেমন সক্রিয় হয়ে আমার ঘরে ঢুকে তোমাদের ধরে নিতে চাইছে। ওদের উদ্দেশ্য একটাই, দেবতার কাছে আত্মা উৎসর্গ করা।' ভয়ে কারো মুখে কথা নেই। নিলেশ কাঁপা গলায় বললেন, 'তাহলে আমাদের এখানে আনার আসল কারণ কী এটাই? তুমি কি আমাদেরকে পাপাত্মার হাতে তুলে দিতে চাও?'
তাশি থাকালি বললেন, 'সেকথা পরে জানবে। আমি এই এলাকার রক্ষক। তোমাদের বাঁচাতে হলে দেবতার সঙ্গে চুক্তি ভাঙতে হবে। মনে রেখো, চুক্তি ভাঙার জন্য মূল্য দিতে হবে।' মাহির সাহস করে প্রশ্ন করল, 'তুমি আসলে কে? তুমি কি পাপাত্মার দূত?' তিনি বললেন, 'আমি তাশি থাকালি, দেবতার পুরোহিতের বংশধর। আমার কাজ হলো আগন্তুকদের সতর্ক করা। যারা ভয় পায় না, যারা সাহসী, তাদের দিয়েই অভিশাপ ভাঙাতে চেষ্টা করি।' কথাটা শেষ করেই তাশি থাকালি উঠে প্রদীপটা জ্বালালেন। আলো ছড়িয়ে পড়তেই দেখা গেল জানালার বাইরে আরও কিছু চোখ জ্বল জ্বল করছে। চোখগুলো অস্থির হয়ে উঠেছে, ভেতরে ঢোকার জন্য।
তাশি থাকালি বললেন, 'ওগুলো পাপাত্মার চোখ। মানুষের রক্তের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে এসেছে। এখনো ঠিক বুঝতে পারছে না, তোমাদের শরীরে মানুষের রক্ত বইছে, না কি পশুর রক্ত। আমি আগেই জানতাম এমন কিছু ঘটতে পারে। তাই ইচ্ছে করেই তোমাদের পশুর রক্ত খাইয়েছি। এতে আত্মারা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে, তাদের মনে সন্দেহ জেগেছে, আসলে তোমরা মানুষ না কি পশু।' তাশি থাকালির কথা শুনে দলের সবাই কিছুটা স্বস্তি পেল। এবার তারা বুঝতে পেরেছে, রক্ত খাওয়ানো হয়েছিল আসলে তাদের রক্ষা করার জন্যই। তাশি থাকালি সত্যিই তাদের বাঁচাতে চাইছেন।
তাশি থাকালি আবার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, 'তোমাদের মধ্যে একজনকে উৎসর্গ করলে বাকিরা মুক্তি পাবে। দেবতার অভিশাপ ভাঙার একমাত্র উপায় এটাই।' এরই মধ্যে পর্বতের উপরের দিকে বজ্রপাতের মতো এক প্রচণ্ড শব্দ হলো। ঘরটাও কেঁপে উঠল। তাশি থাকালি বললেন, 'দেবতা এসেছেন। এখন তোমাদের সাহসের পরীক্ষা নেওয়া হবে। একজনকে সম্মতি দিতে হবে নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য। অভিশাপ ভাঙতে হলে তোমাদের একজনকে এই সিদ্ধান্তটা নিতেই হবে।' মাহির বললেন, 'রক্ত ছাড়া অন্য কিছু দিলে কি তোমার দেবতা খুশি হবেন? তাহলে আমি ব্যবস্থা করব।' তাশি থাকালি মাথা নেড়ে বললেন, 'না, রক্ত ছাড়া দেবতা কিছুই চান না। একজনের উৎসর্গে চারজনের জীবন রক্ষা পাবে। কেউ যদি নিজে থেকে এগিয়ে না আস, তবে পাঁচজন একসাথে ধ্বংস হয়ে যাবে।'



