মদিনা সফর হজ বা উমরার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও হৃদয়স্পর্শী অংশ। এখানে এসে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)–এর রওজা জিয়ারত করা, তাঁর প্রতি সালাম পেশ করা এবং মসজিদে নববীতে ইবাদত করা মুসলমানদের জন্য বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয়। নিচে রওজা জিয়ারতের নিয়ম ও আদব নতুনভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করা হলো।
রওজা জিয়ারতের ফজিলত
হজের সফরে মদিনায় যাওয়া, মসজিদে নববীতে নামাজ আদায় করা এবং নবীজির (সা.) কবর জিয়ারত করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল। এ সম্পর্কে হাদিসে এসেছে— ‘যে ব্যক্তি হজ করার পর আমার ওফাতের পরে আমার কবর জিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবিত অবস্থায় আমাকে সাক্ষাৎ করল।’ (বায়হাকি ৩৮৫৫)
আরেক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে— ‘যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করবে, তার জন্য আমার শাফাআত আবশ্যক হয়ে যাবে।’ (দারাকুতনি ১৯৪)
এছাড়াও নবীজি (সা.) বলেছেন— ‘কেউ আমার প্রতি সালাম পাঠালে আল্লাহ আমার রূহ ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি তার সালামের জবাব দিতে পারি।’ (আবু দাউদ ২০৪১)
মদিনা সফরের গুরুত্ব
তাই হজে গেলে সুযোগ অনুযায়ী আগে বা পরে অন্তত একবার মদিনায় গিয়ে নবীজির (সা.) রওজা জিয়ারত করা উচিত। সেখানে গিয়ে তার প্রতি সালাত ও সালাম পেশ করা একটি মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত।
মসজিদে নববীতে প্রবেশের আদব
মদিনায় পৌঁছে মসজিদে নববীতে প্রবেশের সময় সুন্নত আদবগুলো মেনে চলতে হবে। মসজিদে ঢুকে প্রথমেই ‘তাহিয়্যাতুল মসজিদ’ নামাজ আদায় করুন। সুযোগ থাকলে রিয়াজুল জান্নাহতে নামাজ আদায় করা উত্তম, নতুবা মসজিদের যেকোনো স্থানে আদায় করা যাবে। নামাজ শেষে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন এবং নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
রওজার সামনে সালাত ও সালাম পেশ
নামাজ শেষে নবীজির (সা.) রওজার সামনে গিয়ে বিনয়ের সঙ্গে সালাম পেশ করুন—
আরবি: السَّلاَمُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ ...
উচ্চারণ: ‘আস-সালামু আলাইকা আইয়ুহান-নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারাকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।’
অর্থ: হে নবী! আপনার ওপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন করে রহমত বর্ষণ করেছিলেন ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করুন, যেমন করে বরকত নাজিল করেছিলেন ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহিমান্বিত।
ইমানের সাক্ষ্য প্রদান
রওজার সামনে দাঁড়িয়ে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করুন—
আরবি: أَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
উচ্চারণ: ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা-শারীকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহূ ওয়া রাসূলুহু।’
অর্থ: ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নাই, তিনি একক, তার কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসুল।’
শাফাআত কামনার দোয়া
নবীজির (সা.) দরবারে দাঁড়িয়ে শাফাআতের নিয়তে দোয়া করুন—
আরবি: يَا رَسُولَ اللَّهِ، سَمِعْتُ اللَّهَ يَقُولُ: وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذ ظَّلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا، قَدْ جِئْتُكَ مُسْتَغْفِرًا مِنْ ذُنُوبِي، مُسْتَشْفِعًا بِكَ إِلَى رَبِّي.
উচ্চারণ: ইয়া রাসুলাল্লাহ, সামি'তুল্লাহা ইয়াকুলু: ওয়া লাও আন্নাহুম ইজ জালামু আনফুসাহুম জাউকা ফাসতাগফারুল্লাহ ওয়া আসতাগফারা লাহুমুর রাসুলু লাওয়াজাদুল-ল্লাহা তাওয়াবার রাহিমা, ক্বাদ জি'তুকা মুসতাগফিরান মিন জুনুবি, মুসতাশফি'আন বিকা ইলা রাব্বি।
অর্থ: ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি আল্লাহকে বলতে শুনেছি: “তারা যখন নিজেদের ওপর জুলুম করেছিল, তখন যদি তারা তোমার কাছে আসত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসুলও যদি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, তবে তারা অবশ্যই আল্লাহকে তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু হিসেবে পেত।” (সুরা নিসা: ৬৪) তাই আমি আমার গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে এবং আমার রবের কাছে আপনার সুপারিশ কামনা করে আপনার দরবারে উপস্থিত হয়েছি।’ (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, আল আযকার)
সাহাবিদের কবর জিয়ারত
রওজা জিয়ারতের পর পাশে থাকা হজরত আবু বকর (রা.)–এর কবরের কাছে গিয়ে সালাম দিন ও দোয়া করুন। এরপর হজরত ওমর (রা.)–এর কবরেও সালাম ও দোয়া করুন।
মদিনায় রওজা জিয়ারত শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আত্মিক সংযোগের এক অনন্য প্রকাশ। যথাযথ আদব ও সুন্নত অনুসরণ করে এই জিয়ারত সম্পন্ন করলে তা মুমিনের ইমানকে সুদৃঢ় করে এবং অন্তরে এক গভীর প্রশান্তি এনে দেয়। তাই সচেতনতা, বিনয় এবং আন্তরিকতার সঙ্গে এই মহান আমল আদায় করা উচিত।



