হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তবে অনেকের মধ্যে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে যে, হজ করতে গেলে নারীদের পর্দা করতে হয় না। এমনকি কিছু দ্বীনদার নারীও মনে করেন, ‘হজের সময় পর্দার বিধান শিথিল হয়ে যায়’। কিন্তু ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে এই ধারণা সম্পূর্ণভাবে সঠিক নয়। বাস্তবে, ইহরামের অবস্থাতেও গায়রে মাহরাম পুরুষদের সামনে নারীদের পর্দা করা অপরিহার্য ও বাধ্যতামূলক।
ইহরামে পর্দার বিশেষ বিধান
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে যে, ইহরামের হালতে নারীদের জন্য মুখমণ্ডলে কাপড় সরাসরি লাগানো—যেমন নিকাব বা বোরকা স্টাইল—নিষিদ্ধ। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে গায়রে মাহরামের সামনে মুখ খোলা রাখবেন। বরং শরিয়তের নির্দেশনা হলো, প্রয়োজনে চাদর বা ওড়না ব্যবহার করে মুখ ঢেকে রাখা, তবে তা সরাসরি লাগানো যাবে না।
হাদিসের আলোকে নির্দেশনা
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: ‘আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে ইহরাম অবস্থায় ছিলাম। পথচারীরা যখন আমাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করত, তখন আমরা আমাদের চাদর মাথা থেকে সামনে ঝুলিয়ে মুখ ঢেকে নিতাম। তারা চলে গেলে আবার মুখ খুলে দিতাম।’ (আবু দাউদ ১৮৩৩)। এই হাদিসটি ইহরাম অবস্থায় পর্দার গুরুত্ব ও পদ্ধতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
ইহরামের সময়সীমা ও পর্দার অবস্থান
মুখে কাপড় সরাসরি লাগানো নিষেধাজ্ঞাটি কেবল ইহরামের সময়ের জন্য প্রযোজ্য। ওমরার ক্ষেত্রে সাধারণত ১–২ দিন এবং হজের ক্ষেত্রে প্রায় ৩–৪ দিন এই বিধান কার্যকর থাকে। তবে কেউ ইফরাদ বা কিরানের নিয়তে ইহরাম বাঁধলে সময় কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। এই অল্প কয়েকটি দিন ছাড়া বাকি সময়—অর্থাৎ ইহরামমুক্ত অবস্থায়—নারীদের জন্য পর্দার বিধান সম্পূর্ণভাবে বহাল থাকে। তাই ইহরামের বাইরে বেপর্দা চলাফেরা করার কোনো সুযোগ বা অজুহাত ইসলামে স্বীকৃত নয়।
মদিনা সফরে পর্দার গুরুত্ব
মদিনা মুনাওয়ারার সফরে ইহরামের কোনো সম্পর্কই নেই। সেখানে অবস্থানকালীন সময়ে মুখ খোলা রাখা বা গায়রে মাহরামদের সামনে পর্দা না করা—এগুলো স্পষ্টতই ভুল ধারণা এবং অজ্ঞতার পরিচয়। এই পবিত্র সফরের পূর্ণ বরকত লাভ করতে হলে, নারীদের উচিত যথাযথ পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখা। কিতাবুল হজ গ্রন্থে মাওলানা আশেকে ইলাহী বুলন্দশহরী (পৃষ্ঠা ২৮–২৯) এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।
হজ: ইবাদতের পূর্ণতা ও শালীনতা
হজ একটি পবিত্র ইবাদত—এটি কোনো বিধান শিথিল করার সুযোগ নয়, বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যকে পূর্ণতা দেওয়ার সময়। ইহরামের বিশেষ বিধান থাকলেও, তা কখনোই পর্দা পরিত্যাগের অনুমতি দেয় না। বরং নারীদের উচিত পরিস্থিতি ও শরিয়তের সীমারেখা মেনে সর্বোচ্চ শালীনতা রক্ষা করা। সচেতনতা, জ্ঞান এবং নিয়তের শুদ্ধতার মাধ্যমেই হজের প্রকৃত সৌন্দর্য ও বরকত অর্জন সম্ভব।
সর্বোপরি, হজের সময় নারীদের পর্দা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। ভুল ধারণা থেকে দূরে থাকা এবং ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা অনুসরণ করাই হলো সফল হজের মূল চাবিকাঠি। এই পবিত্র সফরে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পর্দা ও শালীনতা বজায় রাখা প্রতিটি নারীর জন্য কর্তব্য।



