হজের মাসে ওমরাহ: প্রচলিত ভুল ধারণা ও সঠিক বিধান
অনেক মুসলমানের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে যে, হজের মাসসমূহে ওমরাহ করা মাকরুহ বা অনুচিত। কিন্তু ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝতে হলে হজের মাসগুলোর পরিচয়, নির্দিষ্ট দিন এবং শরিয়তের বিধান সম্পর্কে পরিষ্কার জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। এই নিবন্ধে আমরা হজের মাসে ওমরাহ করার বিধান, ফজিলত এবং সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
হজের মাসে ওমরাহ করার শরিয়তসম্মত বিধান
হজের মাস বলতে হিজরি ক্যালেন্ডারের তিনটি মাসকে বোঝানো হয়: শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ। এই তিন মাসের মধ্যে শুধুমাত্র হজের নির্দিষ্ট পাঁচ দিনে, অর্থাৎ জিলহজ মাসের ৯, ১০, ১১, ১২ ও ১৩ তারিখে ওমরাহ করা মাকরুহ তাহরিমি হিসেবে গণ্য হয়। তাই এই পাঁচ দিনে ওমরাহ আদায় করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
তবে এই দিনগুলো ছাড়া বাকি সময়ে ওমরাহ করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং জায়েজ। নিচের তালিকায় স্পষ্টভাবে দেখানো হলো:
- শাওয়াল মাসে ওমরাহ করা যায়।
- জিলকদ মাসে ওমরাহ করা যায়।
- জিলহজ মাসের প্রথম ৮ দিনেও ওমরাহ করা জায়েজ।
সুতরাং, হজের মাসে ওমরাহ করা নিষিদ্ধ বা সর্বদা মাকরুহ—এ ধারণা ভুল। বরং নির্দিষ্ট পাঁচ দিন বাদে বাকি সময়ে ওমরাহ আদায় করা শরিয়তসম্মত এবং বৈধ।
হজের মাসে ওমরাহর ফজিলত ও গুরুত্ব
অনেক ইসলামী আলেম ও বিদ্বান ব্যক্তি হজের মাসসমূহে ওমরাহ করাকে ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর প্রধান কারণ হলো, নবীজি (সা.) তাঁর একাধিক ওমরাহ এই মাসগুলোতেই আদায় করেছেন। উদাহরণস্বরূপ:
- হুদায়বিয়ার ওমরাহ — জিলকদ মাসে সম্পন্ন হয়।
- কাজা ওমরাহ — জিলকদ মাসে আদায় করা হয়।
- জি‘রানা ওমরাহ — জিলকদ মাসে সম্পন্ন হয়।
- বিদায় হজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ওমরাহ — জিলকদ মাসে আদায় করা হয়।
তাই যদি কোনো ব্যক্তি নবীজি (সা.)-কে অনুসরণের নিয়তে এই তিন মাসে ওমরাহ আদায় করেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ তিনি দ্বিগুণ সওয়াবের আশা করতে পারেন—একদিকে ওমরাহর সওয়াব এবং অন্যদিকে সুন্নাহ অনুসরণের সওয়াব।
বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে সতর্কতা ও রমজানের গুরুত্ব
যদিও হজের মাসে ওমরাহ করার জন্য আলাদা কোনো স্পষ্ট ফজিলত সম্পর্কে নির্দিষ্ট হাদিস নেই, তবে রমজান মাসের ওমরাহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হাদিসে এসেছে:
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: عُمْرَةٌ فِي رَمَضَانَ تَعْدِلُ حَجًّا
অর্থ: ‘রমজান মাসে একটি ওমরাহ একটি হজের সমতুল্য।’ আরেক বর্ণনায় এসেছে— تَعْدِلُ حَجًّا مَعِي অর্থাৎ ‘আমার সঙ্গে হজ করার সমতুল্য।’ (বুখারি ১৭৮৬, মুসলিম ১২৫৬)। তাই রমজান মাসে ওমরাহ আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ, যা হজের মাসের তুলনায় আলাদা মর্যাদা রাখে।
শাওয়াল ও জিলকদ কেন হজের মাস হিসেবে পরিচিত?
হিজরি ক্যালেন্ডারের শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজ—এই তিনটি মাসকে হজের মাস বলা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন: الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَعْلُومَاتٌ অর্থাৎ ‘হজের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস রয়েছে।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৯৭)। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা হজের মাসগুলোর গুরুত্ব ও বিধান বর্ণনা করেছেন, যেখানে হজের নিয়তকারীদের জন্য স্ত্রী সহবাস, গুনাহ এবং ঝগড়া-বিবাদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
হজের মাস হওয়ার প্রকৃত অর্থ হলো, এই সময়ের মধ্যেই হজের ইহরাম বাঁধতে হয়। শাওয়াল মাস শুরু হওয়ার আগে হজের ইহরাম বাঁধা বৈধ নয়, বরং শাওয়াল থেকে ইহরাম শুরু করা যায়। যদি কেউ শাওয়ালের শুরুতেই হজের নিয়তে ইহরাম বাঁধে এবং তাওয়াফ ও সাঈ করে, তবে তা হজের অংশ হিসেবেই গণ্য হবে। তবে আরাফায় অবস্থানসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আমল নির্ধারিত তারিখেই আদায় করতে হবে।
উপসংহার: সঠিক জ্ঞানের গুরুত্ব
হজের মাসে ওমরাহ করা নিষিদ্ধ বা সর্বক্ষেত্রে মাকরুহ—এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বরং নির্দিষ্ট পাঁচ দিন ছাড়া বাকি সময়গুলোতে ওমরাহ করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং অনেক ক্ষেত্রে ফজিলতপূর্ণ। তবে যে কোনো ইবাদত আদায়ের ক্ষেত্রে সঠিক জ্ঞান থাকা অপরিহার্য, যাতে তা শরিয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক জ্ঞান ও সহিহ আমলের তাওফিক দান করুন। আমিন।



