পৃথিবীর অন্যান্য ধর্ম-দর্শন থেকে ইসলামের একটি মৌলিক পার্থক্য হলো, ইসলাম দেহ ও আত্মার স্বভাবজাত চাহিদা ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেছে। ইসলাম কোনো মুসলমানকে জাগতিক আকাঙ্ক্ষা, জৈবিক প্রয়োজন ও পার্থিব চাহিদা থেকে বারণ করে না, বরং ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় ও মধ্যপন্থার কথা বলে।
কোরআনে দুনিয়া ও আখেরাতের সমন্বয়
পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতে জৈবিক ও আত্মিক, দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। যেমন সুরা কাসাসের ৭৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে তুমি আখেরাতে স্থায়ী সুখভোগের আবাস অনুসন্ধান করো, আর দুনিয়ায় তোমার অংশের কথা ভুলে যেয়ো না। মানুষের কল্যাণ সাধন করো, যেমন আল্লাহ তোমার কল্যাণ করেছেন। পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির কামনা করো না, নিশ্চয় আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।’
পরিমিতিবোধ বজায় রেখে সব ধরনের বৈধ নান্দনিক চর্চা ও পছন্দের বিষয় উপভোগ করার অনুমতি দিয়েছে ইসলাম। সুরা আরাফের ৩১-৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রতিটি নামাজের সময় সুন্দর পোশাক পরিচ্ছদ গ্রহণ করো, আর খাও এবং পান করো। তবে অপব্যয় ও অমিতাচার করবে না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অপব্যয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ আরও বলা হয়েছে, ‘বলো, যেসব সৌন্দর্য-শোভামণ্ডিত বস্তু ও পবিত্র জীবিকা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন কে তা হারাম করল? বলো, সেগুলো হচ্ছে ইমানদারদের জন্য দুনিয়ার জীবনে, বিশেষভাবে কিয়ামতের দিনে।’
প্রার্থনায় সমন্বয়
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মুমিনদের শিখিয়ে দিয়েছেন কীভাবে জাগতিক ও পরজাগতিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রার্থনা করতে হবে। সুরা বাকারার ২০০-২০২ নম্বর আয়াতে কিছু লোক বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দাও এবং আখিরাতেও কল্যাণ দাও এবং আমাদের জাহান্নামের আজাব হতে রক্ষা করো।’ আল্লাহ বলেন, ‘এরাই সেই লোক, যাদের কৃতকার্যে তাদের প্রাপ্য অংশ রয়েছে এবং আল্লাহ সত্বর হিসাব গ্রহণকারী।’
হালালকে হারাম করা নিষেধ
সুরা মায়েদার ৮৭-৮৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, পবিত্র বস্তুরাজি যা আল্লাহ তোমাদের জন্য হালাল করে দিয়েছেন সেগুলোকে হারাম করে নিও না আর সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।’ এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো, আল্লাহ হালাল বিষয়কে নিষিদ্ধ করাকে সীমালঙ্ঘন বলে আখ্যা দিয়েছেন। এটি জৈবিক ও আত্মিক সমন্বয়ের পথ থেকে বিচ্যুতি ও সীমা লঙ্ঘন।
বৈরাগ্যবাদ প্রত্যাখ্যান
সুরা হাদিদের ২৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর বৈরাগ্যবাদের যে বিষয়টা, তা তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল। আমি তাদের ওপর তা বাধ্যতামূলক করিনি। বস্তুত তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানই করতে চেয়েছিল, কিন্তু তারা তা যথাযথ পালন করেনি।’ কোরআনের এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই আল্লাহর নবী (সা.) বলেছেন, ইসলামে কোনো বৈরাগ্যবাদ নেই।
জগৎ ও মহাবিশ্বের কর্তৃত্ব
আল্লাহ জগৎ ও পৃথিবীকে মানুষের জন্য অনুগত করে দেওয়ার কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন। সুরা বাকারার ২৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে তা তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।’ সুরা জাসিয়াহর ১৩ নম্বর আয়াতে আরও বলা হয়েছে, ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা সবই তিনি নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের কাজে লাগিয়ে রেখেছেন।’ এই আয়াতগুলো বস্তু ও জড়জগতের ওপর মানুষের কর্তৃত্ব তুলে ধরে, যা আধুনিক যুগের আগে অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
উপসংহার
কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের আধ্যাত্মিকতা এবং লাগামহীন ভোগ-বিলাসের বস্তুবাদের মধ্যবর্তী এই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানটি মানব ও সমাজজীবনের জন্য অপরিহার্য। পৃথিবীতে বিদ্যমান শিক্ষা বা জীবন-দর্শনগুলোর মধ্যে ইসলাম ছাড়া আর কোথাও এই অনন্য ভারসাম্য, মধ্যপন্থা ও সমন্বয়ের দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায় না।



