কোরআন সংকলনের ইতিহাস: আবু বকরের যুগান্তকারী উদ্যোগ
কোরআন সংকলন: আবু বকরের যুগান্তকারী উদ্যোগ

ইসলামের ইতিহাসে কোরআন সংকলন এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা এই পবিত্র গ্রন্থের বিশুদ্ধতা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর তত্ত্বাবধানে এই মহান কাজ সম্পন্ন হয়। এই সংকলনের পেছনে ছিল সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট এবং এটি সম্পাদনে অবলম্বন করা হয়েছিল সর্বোচ্চ সতর্কতা ও নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

যেভাবে সংকলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়

ইয়মামার যুদ্ধে শহীদদের মধ্যে কোরআনের অনেক হাফেজও ছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হজরত ওমরের সঙ্গে পরামর্শ করে আবু বকর (রা.) কোরআন সংকলনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ফলে চামড়ার টুকরা, হাড়, খেজুরের ডাল এবং মানুষের হৃদয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোরআনের অংশগুলো একত্র করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

জায়েদ (রা.) বলেন, ‘ইয়মামার যুদ্ধের পর আবু বকর আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর কাছে গেলে দেখতে পাই, সেখানে ওমরও উপস্থিত।’ আবু বকর (রা.) এই মহান দায়িত্ব জায়েদ ইবনে সাবিতের ওপর অর্পণ করেন। জায়েদ (রা.) বলেন, ‘ইয়মামার যুদ্ধের পর আবু বকর আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তাঁর কাছে গেলে দেখতে পাই, সেখানে ওমরও উপস্থিত। আবু বকর (রা.) আমাকে লক্ষ্য করে বলেন, “ওমর আমার কাছে এসে বলছেন, ইয়মামার যুদ্ধে কোরআনের অনেক হাফেজ শহীদ হয়েছেন। অন্যান্য জায়গায়ও কোরআনের হাফেজগণ শহীদ হতে পারেন। তাঁদের শাহাদাতের ফলে একসময় কোরআন বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। আমার মত হলো, আপনি কোরআন সংকলনের নির্দেশ জারি করুন।” আমি ওমরকে বলি, “নবীজি যা করেননি, তা আমি কীভাবে করি?” ওমর (রা.) বলেন, “আল্লাহর কসম, অবশ্যই এটি একটি কল্যাণকর কাজ।” তিনি এ নিয়ে অব্যাহত পীড়াপীড়ি করতে থাকেন। একপর্যায়ে আল্লাহ–তাআলা এ ব্যাপারে আমার বক্ষ উন্মোচিত করে দেন। এখন ওমরের মতোই আমার মত হচ্ছে কোরআন সংকলন করা দরকার।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাহাবি জায়েদ কেন নির্বাচন

আবু বকর (রা.) এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য আনসারি সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিতকে মনোনীত করেন। জায়েদ ছিলেন নবীজির অন্যতম ওহি লেখক। দায়িত্ব অর্পণের সময় আবু বকর তাঁকে বলেন, ‘তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক। তোমার ওপর আমরা কোনো প্রকার অপবাদ পাইনি। তুমি তো আল্লাহর রাসুলের ওহি লেখকদের একজন। অতএব, তুমি কোরআনের বিভিন্ন অংশ খুঁজে খুঁজে তা সংকলন করতে থাকো।’ জায়েদ (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমাকে যদি পাহাড় সরানোর নির্দেশ দেওয়া হতো, তাহলে সেটা আমার কাছে কোরআন সংকলন অপেক্ষা সহজ হতো।’ তরুণ সাহাবি জায়েদের বয়স তখন ছিল মাত্র ২১ বছর। এই বয়সেই তাঁর ছিল বিপুল যোগ্যতা ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, যা এই কাজের জন্য অপরিহার্য ছিল। তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত ও সবার নিকট গ্রহণযোগ্য। এ ছাড়া তিনি ছিলেন নবীজির অন্যতম ওহি লেখক, ফলে এ বিষয়ে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল। পাশাপাশি তিনি ছিলেন সেই চার আনসারি সাহাবির অন্যতম, যাঁরা রাসুল (সা.)-এর যুগে পূর্ণ কোরআন মুখস্থ করেছিলেন।

জায়েদ যেভাবে কাজটি করেন

জায়েদ (রা.) বলেন, ‘আমি কোরআনকে খেজুরের ডাল, পাথরের টুকরা, মানুষের বক্ষ, চামড়া এবং হাড় থেকে সংগ্রহ করে সংকলন করতে থাকি। এভাবে কাজ করতে করতে সুরা তাওবার শেষ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছে যাই। কিন্তু সুরা তাওবার শেষ আয়াতটির কোনো খোঁজ পাচ্ছিলাম না। অবশেষে আবু খুজায়মা আনসারির কাছে আয়াতটির সন্ধান পাই। সেটি হচ্ছে, “অবশ্যই তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতেই একজন রাসুল এসেছেন, তোমাদের যে দুঃখ-কষ্ট হয়ে থাকে তা তাঁর জন্য বড়ই বেদনাদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি তিনি করুণাশীল ও অতি দয়ালু। এরপরও তারা যদি বিমুখ হয়ে থাকে, তবে বলে দাও, আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত অন্য কোনো ইলাহ নেই। আমি তাঁরই ওপর নির্ভর করি এবং তিনিই মহান আরশের অধিপতি।”’

কোরআন সংকলনের জন্য যে পন্থা তিনি অবলম্বন করেছিলেন তা হলো, কোনো লেখাকে ততক্ষণ পর্যন্ত কোরআন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতেন না, যতক্ষণ না তা রাসুল (সা.) কর্তৃক লিখিয়ে নেওয়া হিসেবে প্রমাণিত হতো এবং কোনো সাহাবি তা মুখস্থ করে নিয়েছেন বলে সাক্ষ্য দিতেন। শুধু মুখস্থের ওপর ভরসা করা হতো না। একইভাবে কোনো লেখা তখন পর্যন্ত গ্রহণ করতেন না, যতক্ষণ না এর পেছনে এই মর্মে সাক্ষ্য বিদ্যমান থাকত যে এটি রাসুলের সামনে লিপিবদ্ধ করানো হয়েছে এবং তা ওই কিরাতের অনুরূপ, যে কিরাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে।

সংকলিত মাসহাফ সংরক্ষণ

জায়েদ (রা.) কর্তৃক সংকলিত এই মাসহাফটি প্রথমে আবু বকরের কাছে সংরক্ষিত ছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর এটি ওমরের হাতে আসে এবং তাঁর ইন্তেকালের পর তা তাঁর মেয়ে নবীজির স্ত্রী হজরত হাফসার নিকট গচ্ছিত রাখা হয়। এই সংকলনের মাধ্যমে কোরআন বিলুপ্তির আশঙ্কা দূরীভূত হয় এবং কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য এটি একটি সংরক্ষিত আসমানি গ্রন্থ হিসেবে বিদ্যমান থাকে। খলিফা আবু বকরের নির্দেশে এই সংকলন ছিল উম্মতের জন্য এক বিশাল কল্যাণকর কাজ। এটি নিশ্চিত করে যে কোরআন তার ধারাবাহিকতা ও বিন্যাস অনুযায়ী সংরক্ষিত থাকবে।

কোরআনের এই বিন্যাস ছিল স্বয়ং জিবরিল (আ.) কর্তৃক বলে দেওয়া—যখনই কোনো আয়াত অবতীর্ণ হতো, জিবরিল নবীজি (সা.)-কে বলে দিতেন যে, ‘এই আয়াত অমুক সুরার অমুক আয়াতের পর লিখিয়ে নেবেন।’ আলী (রা.) এই মহান কাজের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ–তাআলা আবু বকরের ওপর রহম করুন, তিনিই সর্বপ্রথম কোরআনকে দুই মলাটের মধ্যে লিপিবদ্ধ করান।’ এই সংকলনের মাধ্যমে কোরআন বিলুপ্তির আশঙ্কা দূরীভূত হয় এবং কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য এটি একটি সংরক্ষিত আসমানি গ্রন্থ হিসেবে বিদ্যমান থাকে।