মানুষ প্রতিদিন নানা কিছু চায়—রিজিক, সুস্বাস্থ্য, সফলতা, সম্মান, পারিবারিক শান্তি। এসব চাওয়া স্বাভাবিক ও বৈধ। কিন্তু এমন একটি সম্পদ রয়েছে, যা লাভ করলে দুনিয়া ও আখিরাতের সব কল্যাণ অর্জন সম্ভব; সেটি হলো আল্লাহর ভালোবাসা।
একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হলো আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। কারণ আল্লাহ যার প্রতি সন্তুষ্ট হন, তার জীবন বরকতময় হয়, আমল কবুল হয় এবং আখিরাতে তার জন্য চিরস্থায়ী সফলতা অপেক্ষা করে। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের এমন একটি দোয়া শিখিয়েছেন, যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর ভালোবাসা, আল্লাহপ্রেমিকদের ভালোবাসা এবং এমন আমলের তৌফিক চাইতে পারি যা আমাদের আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়।
আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করতেন—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ حُبَّكَ، وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ، وَالْعَمَلَ الَّذِي يُبَلِّغُنِي حُبَّكَ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা হুব্বাকা, ওয়া হুব্বা মাই-ইউহিব্বুকা, ওয়াল-'আমালাল্লাজি ইউবাল্লিগুনি হুব্বাকা।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার ভালোবাসা চাই, যারা আপনাকে ভালোবাসে তাদের ভালোবাসা চাই এবং এমন কাজের প্রতি ভালোবাসা চাই, যা আমাকে আপনার ভালোবাসার কাছে পৌঁছে দেয়।’ (তিরমিজি ৩২৩৫)
আল্লাহ কাদের ভালোবাসেন?
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন—
- মুত্তাকীগণ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: ৭৬)
- সৎকর্মশীলগণ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: ১৯৫)
- ধৈর্যশীলগণ: ‘আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: ১৪৬)
- ন্যায়পরায়ণগণ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-মায়েদা: ৪২)
- তাওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীগণ: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: ২২২)
আল্লাহর ভালোবাসার প্রকৃত পরিচয়
অনেকে মনে করেন আল্লাহকে ভালোবাসা শুধু একটি আবেগের নাম। কিন্তু ইসলামে আল্লাহর ভালোবাসা হলো আনুগত্য, আত্মসমর্পণ এবং সুন্নাহর প্রকৃত অনুসরণ ও অনুকরণের নাম। আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ
‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ কর; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।’ (সুরা আল-ইমরান: ৩১)
এই আয়াতকে অনেক আলেম “মাহাব্বাহর আয়াত” বা ভালোবাসার আয়াত বলে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ এখানে আল্লাহর ভালোবাসা লাভের সহজ পথ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ।
কীভাবে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করা যায়?
- কুরআনের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করা
- ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল আমলের প্রতি যত্নশীল হওয়া
- বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করা
- রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা
- আল্লাহর জন্য মানুষকে ভালোবাসা
- গোপনে নেক আমল করা
- দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা প্রার্থনা করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ عَبْدًا نَادَى جِبْرِيلَ: إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ فُلَانًا فَأَحِبَّهُ
‘যখন আল্লাহ কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি জিবরিলকে ডেকে বলেন, “আল্লাহ অমুককে ভালোবাসেন, তুমিও তাকে ভালোবাসো।” এরপর আসমানবাসীদের মধ্যেও তার ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।’ (বুখারি ৩২০৯, মুসলিম ২৬৩৭)
আমরা জীবনে অসংখ্য জিনিসের জন্য দোয়া করি, কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান দোয়াগুলোর একটি হলো আল্লাহর ভালোবাসা লাভের দোয়া। কারণ আল্লাহর ভালোবাসা অর্জিত হলে দুনিয়ার বিপদ সহজ হয়ে যায়, ইবাদতে স্বাদ আসে, অন্তর প্রশান্ত হয় এবং আখিরাতের সফলতা নিশ্চিত হয়। তাই আসুন, প্রতিদিনের দোয়ায় এই মহান আবেদনটি যোগ করি—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ حُبَّكَ، وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ، وَالْعَمَلَ الَّذِي يُبَلِّغُنِي حُبَّكَ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা হুব্বাকা, ওয়া হুব্বা মাই-ইউহিব্বুকা, ওয়াল-'আমালাল্লাজি ইউবাল্লিগুনি হুব্বাকা।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার ভালোবাসা চাই, আপনার প্রিয় বান্দাদের ভালোবাসা চাই এবং এমন আমলের তৌফিক চাই যা আমাকে আপনার ভালোবাসার কাছে পৌঁছে দেয়।’
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তার প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।



