কুরবানি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা তাকওয়া, আত্মত্যাগ ও আল্লাহর আনুগত্যের প্রতীক। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট নিয়মে পশু জবেহ করার মাধ্যমেই এ ইবাদত আদায় করা হয়। কিন্তু অনেক মুসলমান কুরবানির পশু জবাইয়ের সঠিক পদ্ধতি, দোয়া ও সুন্নাহসম্মত আদব সম্পর্কে জানেন না। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে কুরবানি করেছেন এবং উম্মতকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
কুরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত
আল্লাহ তাআলা বলেন—فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‘অতএব তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় কর এবং কুরবানি কর।’ (সুরা কাউসার: আয়াত ২) অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—لَنْ يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنْكُمْ ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানির পশুর গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: আয়াত ৩৭) তাই কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি একটি ইবাদত, যা সুন্নাহ অনুযায়ী আদায় করা জরুরি।
নিজ হাতে কুরবানি করা উত্তম
হাদিসের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ বুখারি ও মুসলিমে এসেছে—‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর কুরবানির পশু নিজ হাতে জবাই করেছেন।’ (বুখারি, মুসলিম) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, নিজের কুরবানি নিজ হাতে করা উত্তম। তবে অন্য কাউকে দিয়ে কুরবানি করালেও কুরবানি আদায় হয়ে যাবে।
কুরবানির পশু জবেহের মৌলিক নিয়ম
কুরবানির পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
১. আল্লাহর নামে জবেহ করা
জবাইয়ের সময় অবশ্যই ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশু জবেহ করা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন—فَاذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَيْهَا ‘তোমরা পশু জবেহের সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর।’ (সুরা হজ: আয়াত ৩৬) জবাইয়ের সময় বলতে হবে—بِسْمِ اللهِ، اللهُ أَكْبَرُ ‘আল্লাহর নামে শুরু করছি, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।’
২. নির্ধারিত চারটি রগ কাটা
পশু জবেহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য— খাদ্যনালী, শ্বাসনালী এবং গলার দুই পাশের দুটি প্রধান রগ কেটে দিতে হবে। এগুলো কাটা হলেই জবেহ শুদ্ধ হয়ে যাবে।
পশু জবেহের সময় যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে
- ছুরি ধারালো করা: পশুকে কষ্ট না দিতে ছুরি ভালোভাবে ধার দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—إِنَّ اللَّهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ... وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ وَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ ‘আল্লাহ সব কিছুর ওপর অনুগ্রহ ও উত্তম আচরণ অপরিহার্য করেছেন। তোমরা যখন জবেহ করবে, উত্তমভাবে জবেহ করবে। তোমাদের কেউ যেন তার ছুরি ধারালো করে এবং পশুকে কষ্টমুক্ত রাখে।’ (মুসলিম ১৯৫৫)
- অন্য পশুর সামনে জবেহ না করা: এক পশুর সামনে অন্য পশু জবেহ করা বা ছুরি ধার দেওয়া ঠিক নয়। এতে পশু ভয় পায় এবং কষ্ট পায়।
- পশুকে বাম কাতে শোয়ানো: কুরবানির সময় পশুকে বাম পাশে শোয়ানো উত্তম। এ সময় কিবলামুখী করে জবেহ করা মুস্তাহাব।
কুরবানির পশু জবেহের দোয়া
পশু জবেহের আগে এ দোয়া পড়া উত্তম—اَللَّهُمَّ إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ عَلَى مِلَّةِ إِبْرَاهِيْمَ حَنِيفًا وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ، إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، لَا شَرِيكَ لَهُ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ، بِسْمِ اللهِ اللهُ أَكْبَرُ، اَللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ উচ্চারণ: ‘ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা আলা মিল্লাতি ইবরাহিমা হানিফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। লা শারিকা লাহু ওয়া বিজালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন। বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা।’ অর্থ: ‘আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখমণ্ডল সেই সত্তার দিকে ফিরালাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয়ই আমার নামাজ, কুরবানি, জীবন ও মৃত্যু বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তার কোনো শরিক নেই। আমাকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর নামে, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। হে আল্লাহ! এ কুরবানি তোমারই পক্ষ থেকে এবং তোমারই উদ্দেশ্যে।’ (আবু দাউদ ২৭৯৫, মুসনাদে আহমাদ)
সংক্ষিপ্ত দোয়া
যদি বড় দোয়া পড়া সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত এ দোয়া পড়তে হবে—بِسْمِ اللهِ اللهُ أَكْبَرُ، اَللَّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ উচ্চারণ: ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা।’ অর্থ: ‘আল্লাহর নামে শুরু করছি, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। হে আল্লাহ! এ কুরবানি তোমার পক্ষ থেকে এবং তোমারই জন্য।’
জবাইয়ের পরের দোয়া
নিজের কুরবানি হলে اَللَّهُمَّ تَقَبَّلْهُ مِنِّي كَمَا تَقَبَّلْتَ مِنْ حَبِيبِكَ مُحَمَّدٍ وَخَلِيلِكَ إِبْرَاهِيمَ উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু মিন্নি কামা তাকাব্বালতা মিন হাবিবিকা মুহাম্মাদিও ওয়া খালিলিকা ইবরাহিম।’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি এ কুরবানি আমার পক্ষ থেকে কবুল করুন, যেমন আপনি আপনার প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ (সা.) ও বন্ধু ইবরাহিম (আ.)-এর পক্ষ থেকে কবুল করেছিলেন।’ অন্যের কুরবানি জবাই করলে اَللَّهُمَّ تَقَبَّلْهُ مِنْهُ/مِنْهُمْ كَمَا تَقَبَّلْتَ مِنْ حَبِيبِكَ مُحَمَّدٍ وَخَلِيلِكَ إِبْرَاهِيمَ উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু মিনহু/মিনহুম কামা তাকাব্বালতা মিন হাবিবিকা মুহাম্মাদিও ওয়া খালিলিকা ইবরাহিম।’
কুরবানি একটি মহান ইবাদত, যার প্রতিটি ধাপে রয়েছে সুন্নাহর শিক্ষা। পশু জবেহের সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ, পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শন এবং সুন্নাহ অনুযায়ী দোয়া পাঠ— এসবের মাধ্যমেই কুরবানি পূর্ণতা লাভ করে। তাই শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তাকওয়া ও আন্তরিকতার সঙ্গে কুরবানি আদায় করাই একজন মুমিনের প্রকৃত দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহসম্মতভাবে কুরবানি আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।



