ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে মুমিনের হৃদয়ে চিরস্থায়ী ক্ষত বা আনন্দের রেখা এঁকে দেয়। মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজ তেমনই এক ঘটনা। দীর্ঘ তেইশ বছরের নবুয়তি মিশনের পূর্ণতা এই বিদায় হজ।
হজের ডাক ও প্রস্তুতি
হিজরতের দশম বছর যখন হজের ডাক এলো, তখন মদিনার অলিগলিতে এক অদ্ভুত শিহরণ ছড়িয়ে পড়ল। সাহাবিদের হৃদয়ে একদিকে যেমন ছিল নবীজির সঙ্গে হজে যাওয়ার প্রবল আনন্দ, অন্যদিকে ছিল এক অজানা বিচ্ছেদের সুর।
ঐতিহাসিক সেই যাত্রার সূচনা নবীজি (সা.) ঘোষণা দিলেন, তিনি এ বছর হজে যাবেন। এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই আরবের দিগন্ত থেকে দলে দলে মানুষ মদিনায় জড়ো হতে শুরু করলেন। মরুভূমির তপ্ত ধুলো উড়িয়ে হাজার হাজার মানুষ আসলেন শুধু একটি কামনায়—নবীজির সফরসঙ্গী হওয়া। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)
যাত্রা ও ইহরাম
জিলকদ মাসের ২৫ তারিখ, শনিবার। জোহরের নামাজ শেষে নবীজি (সা.) মদিনার মায়া ত্যাগ করে হজের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। মাত্র কয়েক মাইল দূরে জুল–হুলাইফা নামক প্রান্তরে পৌঁছে তিনি যাত্রাবিরতি করলেন। রাত কাটল সেখানে। সঙ্গে ছিলেন তাঁর পবিত্র স্ত্রীগণ।
রওনার আগে নবীজি (সা.) শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি নেন। আয়েশা (রা.) রাসুলের পবিত্র দেহে সুগন্ধি মাখিয়ে দেন। এরপর নবীজি (সা.) ইহরামের সাদা চাদর গায়ে জড়িয়ে তাঁর উট কাসওয়ার পিঠে সওয়ার হয়ে এগিয়ে যান। জবানে তখন ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...’ ধ্বনি। সাহাবিদের বর্ণনায় সেই দৃশ্য ছিল অভূতপূর্ব।
নবীজির ডানে, বামে, সামনে, পেছনে যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু শুভ্র পোশাকের সমুদ্র। লাখো মানুষের সমবেত কণ্ঠের তালবিয়ায় মক্কার পাহাড়-পর্বতে যেন প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠেছিল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১৩)
হজের কাজ ও আরাফার ভাষণ
নবীজি (সা.) এই সফরে হজ ও ওমরাহর যৌথ নিয়ত করেছিলেন। সঙ্গে ছিল তাঁর কোরবানির পশু। নিয়ম অনুযায়ী, সঙ্গে পশু থাকলে কোরবানির আগে ইহরাম খোলা যায় না; তাই মক্কায় পৌঁছানোর পরও তিনি দীর্ঘ সময় ইহরামের কঠিন নিয়ম মেনে ধৈর্য ধরেছিলেন।
জিলহজের ৪ তারিখ মক্কায় প্রবেশ করে নবীজি (সা.) কাবার তওয়াফ ও সাঈ সম্পন্ন করেন। এরপর হজের মূল কাজ শুরু হয়। ৮ জিলহজ মিনা এবং ৯ জিলহজ তিনি আরাফার ময়দানে তপ্ত রোদের নিচে দাঁড়ান। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২৪৩)
সেই দিনই তিনি প্রদান করেন তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ, যা আজও পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানবাধিকারের দলিল। তিনি ঘোষণা করেন মানুষের রক্ত, সম্পদ ও ইজ্জত আজ থেকে কাবার মতোই পবিত্র। তিনি নারী অধিকার, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের এক মহত্তম ঘোষণা দিয়ে জাহেলিয়াতের অন্ধকারকে চিরতরে বিদায় দিলেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯৮)
শেষ উপদেশ ও কোরআনের বাণী
এই পুরো সফরে নবীজি (সা.) ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষকের মতো। অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে তিনি সাহাবিদের হজের নিয়ম শেখাচ্ছিলেন আর বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, ‘তোমরা আমার কাছ থেকে হজের নিয়ম–কানুন শিখে নাও। কারণ, সম্ভবত এরপর আমি আর হজের সুযোগ পাব না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২৯৭)
আরাফার সেই তপ্ত দুপুরের পরেই নাজিল হলো কোরআনের বাণী, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ইসলামকে পূর্ণ করে দিলাম’। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৩)
এই আয়াত নাজিল হওয়ার পরেই যেন থমকে গিয়েছিল ইতিহাস। পুরো আরাফা প্রাঙ্গণ ছেয়ে যায় এক নিস্তব্ধতায়। আবু বকর (রা.)-সহ অনেক সাহাবি বুঝতে পেরেছিলেন, নবীজির দুনিয়ার মিশন শেষ, তাঁর প্রস্থানের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
সুরা আসরের সেই শাশ্বত শিক্ষা যেন নবীজির হজের ময়দানে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। কাফিররা তাঁকে ক্ষতিগ্রস্ত বলতে চেয়েছিল, কিন্তু মহাকালের স্রষ্টা সময়ের কসম খেয়ে প্রমাণ করে দিলেন—ইমান, আমল ও হকের পথে অটল থাকা নবীজিই পৃথিবীর সবচেয়ে সফল সত্তা। (সুরা আসর, আয়াত: ১-৩; জামিউত তিরমিজি, হাদিস: ৮১৫)
উপসংহার
মোটকথা, বিদায় হজ ছিল বিশ্বমানবতার জন্য নবীজির শেষ উপহার। তিনি তাঁর পবিত্র আমল ও বাণীর মাধ্যমে কেয়ামত পর্যন্ত আগত উম্মতের জন্য হজের যে পূর্ণাঙ্গ চিত্র এঁকে দিয়ে গেছেন, তা প্রতিটি মুমিনের অমূল্য পাথেয়। আল্লাহ আমাদের সেই সুন্নাহর পথে চলার এবং নবীজির সেই পদধূলিমাখা পবিত্র ভূমি জিয়ারত করার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।



