ধর্ষণের ভয়ে আত্মহত্যা নয়: ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর মর্যাদা ও নির্দোষিতা
ধর্ষণের ভয়ে আত্মহত্যা নয়: ইসলামের দৃষ্টিতে নারীর মর্যাদা

বর্তমান সমাজে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও সম্ভ্রমহানির মতো জঘন্য অপরাধ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অনেক নারী মনে প্রশ্ন করেন—যদি ধর্ষণের আশঙ্কা দেখা দেয় বা জোরপূর্বক নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয় থাকে, তাহলে নিজের সম্ভ্রম রক্ষার্থে আত্মহত্যা করা কি জায়েজ? ইসলাম এই সংবেদনশীল বিষয়ে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।

আত্মহত্যা: ইসলামের দৃষ্টিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা

ইসলামের দৃষ্টিতে পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন, আত্মহত্যা কখনো বৈধ নয়। দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, নির্যাতন, অসুস্থতা, সম্ভ্রমহানির আশঙ্কা কিংবা সামাজিক লজ্জা—কোনো কারণেই একজন মানুষ নিজের জীবন নষ্ট করার অনুমতি পায় না। কারণ জীবন আল্লাহর দান, আর সেই জীবনের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا অর্থ: ‘তোমরা নিজেদের হত্যা কর না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ২৯)

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন—وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ অর্থ: ‘তোমরা নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ কর না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৯৫)

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ধর্ষণের শিকার নারী ইসলামি দৃষ্টিতে অপরাধী নয়

যদি কোনো নারী ধর্ষকের কবলে পড়ে, তাহলে তার ওপর ফরজ হলো সর্বশক্তি দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করা। কিন্তু চেষ্টা করার পরও যদি সে জোরপূর্বক নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে সে গুনাহগার নয়; বরং সে একজন মজলুম বা জুলুমের শিকার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইসলাম অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে— জোরপূর্বক সংঘটিত অপরাধের দায় ভুক্তভোগীর ওপর বর্তায় না। বরং অপরাধী ও জালিমই আল্লাহর কাছে জবাবদিহির মুখোমুখি হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِي عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْهِ অর্থ: ‘আল্লাহ আমার উম্মতের অনিচ্ছাকৃত ভুল, ভুলে করা কাজ এবং জোরপূর্বক করানো কাজ ক্ষমা করে দিয়েছেন।’ (ইবনে মাজাহ ২০৪৫)

প্রখ্যাত আলেম ইবনে আবদুল বার বলেন, জোরপূর্বক ধর্ষণের শিকার নারীর ওপর কোনো শাস্তি প্রয়োগ করা হবে না— এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই।

আত্মরক্ষায় প্রতিরোধ করা ইসলামে বৈধ

ইসলাম নারীদের দুর্বল বা অসহায় হতে শেখায় না। বরং আত্মরক্ষার অধিকার দিয়েছে। যদি কোনো নারী নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে প্রতিরোধ করেন এবং সেই সময় আক্রমণকারী নিহত হয়, তাহলে ইসলামি আইনে তার কোনো শাস্তি নেই। আর যদি আত্মরক্ষার সময় নারী নিজেই নিহত হন, তাহলে তিনি শহিদের মর্যাদা লাভ করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—مَنْ قُتِلَ دُونَ مَالِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دَمِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ دِينِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ، وَمَنْ قُتِلَ دُونَ أَهْلِهِ فَهُوَ شَهِيدٌ অর্থ: ‘যে ব্যক্তি তার সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহিদ। যে নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহিদ। যে তার দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহিদ। আর যে তার পরিবার রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সেও শহিদ।’ (আবু দাউদ ৪৭৭২, তিরমিজি ১৪২১)

আলেমদের স্পষ্ট ফতোয়া: আত্মহত্যা জায়েজ নয়

সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলেছে—لَا يَجُوزُ لَهَا أَنْ تَقْتُلَ نَفْسَهَا، وَلَوْ خَافَتْ أَنْ يَقَعَ بِهَا مَا ذُكِرَ قَهْرًا، وَهِيَ مَعْذُورَةٌ إِنْ حَصَلَ مَا خَافَتْ دُونَ رِضَاهَا অর্থ: ‘তার জন্য আত্মহত্যা করা জায়েজ নয়, যদিও সে জোরপূর্বক সম্ভ্রমহানির আশঙ্কা করে। আর তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যদি তা ঘটেও যায়, তাহলে সে নির্দোষ বলে গণ্য হবে।’

যুগোপযোগী শিক্ষা: ভুক্তভোগী নয়, অপরাধী লজ্জিত হোক

ইসলাম ভুক্তভোগী নারীর প্রতি সহমর্মিতা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক সমাজে নির্যাতিত নারীকে দোষারোপ করা হয়, যা ইসলামি ন্যায়ের সম্পূর্ণ বিপরীত। একজন নারী যদি জোরপূর্বক নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে তিনি সম্মানহারা নন; বরং অপরাধীই লাঞ্ছিত ও আল্লাহর কাছে অপরাধী। তাই সমাজের দায়িত্ব হলো নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের মানসিক শক্তি দেওয়া এবং অপরাধীদের কঠোর বিচারের আওতায় আনা।

ইসলাম জীবনকে অত্যন্ত মূল্যবান মনে করে। তাই কোনো পরিস্থিতিতেই আত্মহত্যার অনুমতি দেয় না। ধর্ষণের ভয় বা জোরপূর্বক নির্যাতনের আশঙ্কায় আত্মহত্যা করা জায়েজ নয়। বরং একজন নারীকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে আত্মরক্ষার জন্য। তারপরও যদি তিনি নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে তিনি আল্লাহর কাছে অপরাধী নন; বরং একজন মজলুম, যার জন্য আল্লাহর রহমত ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

আমাদের সমাজেরও উচিত ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করে তার পাশে দাঁড়ানো এবং জালিমদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। আল্লাহ তাআলা সব নারীকে নিরাপদ রাখুন, জালিমদের প্রতিহত করুন এবং মানবতাকে ন্যায় ও মর্যাদার পথে পরিচালিত করুন। আমিন।