রহমান বাবার দর্শন: কাঁটা বপন করলে কাঁটাই ফিরে আসে
রহমান বাবার দর্শন: কাঁটা বপন করলে কাঁটাই ফিরে আসে

মানুষের সভ্যতা যত অগ্রসর হইয়াছে, ততই একটি বিষয় স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে—মানুষ কেবল বাহ্যিক শক্তি দ্বারা টিকিয়া থাকে না—তাহার অস্তিত্বের ভিত গঠিত হয় নৈতিক আচরণ দ্বারা। একটি সমাজের প্রকৃত চরিত্র নির্ধারিত হয় তাহার নাগরিক একে অপরের সহিত কীরূপ আচরণ করে, তাহার উপর। কারণ মানুষ একা বাঁচে না। সে সম্পর্কের মধ্যে বাস করে, প্রতিক্রিয়ার মধ্যে বাস করে এবং সর্বোপরি—নিজ কর্মফল-প্রতিফলের মধ্যেই বাস করে।

রহমান বাবার দর্শন

এই সত্যটিই বহু শতাব্দী পূর্বে গভীর মানবিকতায় উচ্চারণ করিয়াছিলেন পেশোয়ারের সুফি দার্শনিক কবি রহমান বাবা। তিনি বলিয়াছিলেন—ফুল বপন করিলে চারিদিকে বাগান ফুটিবে, আর কাঁটা বপন করিলে সেই কাঁটাই ফিরিয়া নিজের পায়ে বিধিবে। এই উক্তিটি মানবসমাজের এক গভীর বাস্তবতা। মানুষ প্রায়ই মনে করে, সে যদি কাহাকে অপমান করে, প্রতারণা করে, ঘৃণা ছড়ায় কিংবা ক্ষমতার জোরে অন্যকে দমাইয়া রাখে—তাহা হইলে তাহা যেন কেবল চিরকালই একই রকম থাকিবে; কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সমাজের জীবন্ত কাঠামো

সমাজ একটি জীবন্ত কাঠামো, যেইখানে প্রতিটি আচরণ এক অদৃশ্য তরঙ্গের ন্যায় চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে। ঘৃণা কখনো একমুখী থাকে না—ইহা ফিরিয়া আসে। করুণা যেমন প্রতিধ্বনিত হয়, নিষ্ঠুরতাও তেমনই। আজিকার পৃথিবীতে এই সত্য ভয়াবহভাবে দৃশ্যমান। আমরা এমন এক সময়ে বাস করিতেছি, যেইখানে বিদ্বেষকে মতাদর্শের মোড়ক পরানো হয়, বিভাজনকে রাজনৈতিক কৌশল বলা হয়। মানুষ এখন প্রায়ই নৈতিকতাকে সুবিধা অনুযায়ী ব্যবহার করে। নিজের পক্ষে হইলে অন্যায়ও গ্রহণযোগ্য; কিন্তু প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে সামান্য বিচ্যুতিও অপরাধ। এই দ্বিচারিতা আধুনিক সভ্যতার অন্যতম বড় সংকট।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

রহমান বাবার দর্শন এই প্রবণতার বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ গভীর প্রতিবাদ। তিনি মানবতাকে খণ্ডিত সত্তা বলিয়া দেখেন নাই। তাহার দৃষ্টিতে মানবসমাজ একটি দেহের ন্যায়। দেহের এক স্থানে ক্ষত হইলে যন্ত্রণা সমগ্র শরীরে অনুভূত হয়। অতএব, কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা রাষ্ট্র যখন অন্যের প্রতি বিষ ছড়ায়, তখন সেই বিষের বাতাসে শেষ পর্যন্ত তাহাকেও নিঃশ্বাস লইতে হয়। ইতিহাসের দিকে তাকাইলেই ইহার অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। ঘৃণার উপর দাঁড়ানো সাম্রাজ্য, দমন-পীড়নের উপর নির্মিত রাষ্ট্রব্যবস্থা কিংবা প্রতারণার উপর প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা–শেষ পর্যন্ত নিজ ভারেই ভাঙিয়া পড়িয়াছে।

সময় সম্পর্কে সতর্কতা

রহমান বাবার দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হইল সময় সম্পর্কে সতর্কতা। তিনি মানুষকে বলিতেছেন—আলো থাকিতেই পথ সোজা করো। এই বাক্যের মধ্যে শুধু মৃত্যুচিন্তা নহে, একটি গভীর নৈতিক সতর্কবার্তাও নিহিত আছে। মানুষ সাধারণত মনে করে, সংশোধনের জন্য এখনো অনেক সময় আছে। পরে একদিন অন্যায়ের প্রতিবাদ করিবে, পরে একদিন চরিত্র শুদ্ধ করিবে, পরে একদিন মানবিক হইবে; কিন্তু এই ‘পরে' করিবার বিষয়টিই মানুষের সর্ববৃহৎ আত্মপ্রবঞ্চনা। কারণ সময়ের শেষসীমা কাহারও জানা নাই। বর্তমান সমাজ এই সংকটের মধ্য দিয়াই অতিক্রম করিতেছে।

সভ্যতার প্রকৃত পরিমাপ

বাহ্যিক উন্নয়ন, অট্টালিকা, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সভ্যতার প্রকৃত পরিমাপ নহে। সভ্যতার স্থায়িত্ব ইস্পাতের উপর নহে, বিবেকের উপর দাঁড়াইয়া থাকে। রহমান বাবার দর্শন সেই বিস্মৃত সত্যটিই পুনরায় স্মরণ করাইয়া দেয়। এই দর্শনে অহংকারেরও কোনো স্থান নাই। মানুষ যত ক্ষমতাবানই হউক, শেষ পর্যন্ত সে ক্ষণস্থায়ী। এই উপলব্ধি মানুষকে দুর্বল করে না—বরং দায়িত্বশীল করে। যে জানে, তাহার সময় সীমিত, সে অন্যের উপর বিষ ঢালিবার পূর্বে অন্তত একবার চিন্তা করে। মানুষ ভুলিয়া যায় যে, তাহারও পতন আছে, তাহারও সমাপ্তি আছে।

আজকের প্রশ্ন

অতএব, আজ প্রশ্ন একটিই—আমরা কী বপন করিতেছি—ঘৃণা, প্রতিহিংসা ও অবজ্ঞার কাঁটা; নাকি সহমর্মিতা, ন্যায় ও মানবপ্রেমের ফুল? ইতিহাস ও প্রকৃতি কোনো অজুহাত গ্রহণ করে না। তাহারা কেবল ফল ফিরাইয়া দেয়। আজ আমরা যদি বিষ বপন করি, আগামীকাল সেই বিষেই আমাদের নিঃশ্বাস লইতে হইবে। মানবসভ্যতার দীর্ঘ যাত্রাপথে তাই একটি সত্য সর্বদাই অমোঘ—কাঁটা বপন করিয়া কখনো নিরাপদে চলা যায় না।