মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানি: ইসলামি দৃষ্টিকোণ
কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি ভালোবাসা, আত্মত্যাগ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান ইবাদত। কুরবানির দিনগুলোতে অনেকের মনেই একটি আবেগঘন প্রশ্ন জাগে—প্রিয় কোনো মৃত ব্যক্তি, বাবা-মা কিংবা আত্মীয়ের নামে কি কুরবানি করা যাবে? আর যদি করা যায়, তাহলে সেই কুরবানির গোশত কি নিজেরা খেতে পারবে, নাকি পুরোটা গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হবে? ইসলামি শরিয়ত এ বিষয়ে সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কুরআন-হাদিসের আলোকে মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি করা বৈধ এবং তা মৃত ব্যক্তির জন্য সওয়াবের কারণ হতে পারে। তবে এর বিধান নির্ভর করে মৃত ব্যক্তি জীবদ্দশায় কুরবানির জন্য কোনো অসিয়ত করে গেছেন কি না—তার ওপর। নিচে কুরআন, হাদিস ও ফিকহি ব্যাখ্যার আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানি করা কি জায়েজ?
অন্যান্য নফল ইবাদতের মতো মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে নফল কুরবানি করে তার সওয়াব পৌঁছানোর আশা করা যায়। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন— 'এক ব্যক্তি নবীজিকে (সা.) বলল, আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন। আমি মনে করি, তিনি কথা বলতে পারলে সদকা করার অসিয়ত করতেন। আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে কি তিনি সওয়াব পাবেন? নবীজি (সা.) বললেন, হ্যাঁ।' (মুসলিম ৪০৭৪) এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে নেক আমল করা এবং তার সওয়াব পৌঁছানোর আশা করা বৈধ। নবীজি (সা.) নিজের উম্মতের পক্ষ থেকেও কুরবানি করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের পক্ষ থেকে কুরবানি করার পাশাপাশি নিজের উম্মতের পক্ষ থেকেও কুরবানি করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) ও আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত— 'রাসুলুল্লাহ (সা.) কুরবানি করার ইচ্ছা করলে দুটি মোটাতাজা, শিংযুক্ত মেষ ক্রয় করতেন। একটি তিনি তার উম্মতের পক্ষ থেকে, যারা আল্লাহর একত্ব ও তার রিসালাতের সাক্ষ্য দেয় তাদের জন্য কুরবানি করতেন এবং অপরটি নিজের ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি করতেন।' (ইবনে মাজাহ ৩১২২) এ হাদিস মৃত বা জীবিত অন্যের পক্ষ থেকে নফল কুরবানির বৈধতার প্রমাণ বহন করে।
মৃত ব্যক্তি অসিয়ত না করলে কী হবে?
মৃত ব্যক্তি যদি কুরবানির জন্য কোনো অসিয়ত না করে থাকেন, তাহলে তার নামে দেওয়া কুরবানি নফল কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে। এ ক্ষেত্রে— কোরবানির গোশত নিজেরা খেতে পারবে, আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া যাবে এবং গরিবদের মাঝেও বিতরণ করা যাবে। অর্থাৎ সাধারণ কুরবানির মতোই এর গোশত ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
মৃত ব্যক্তি কুরবানির অসিয়ত করে গেলে বিধান কী?
যদি মৃত ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় কুরবানি করার জন্য অসিয়ত করে যান, তাহলে সেই অসিয়ত পূরণের উদ্দেশ্যে দেওয়া কুরবানির গোশতের বিধান ভিন্ন হবে। সে ক্ষেত্রে— নিজেরা ওই গোশত খেতে পারবে না, সম্পদশালী আত্মীয়দেরও দেওয়া যাবে না, পুরো গোশত দরিদ্র ও মিসকিনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। কারণ এটি তখন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ওয়াজিব আদায়ের পর্যায়ে গণ্য হবে।
কুরবানির গুরুত্ব সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন— 'অতএব আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করুন এবং কুরবানি করুন।' (সুরা আল-কাওসার: আয়াত ১–৩) আরও ইরশাদ হয়েছে— 'তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবী ও প্রার্থীকে খাওয়াও। এভাবেই আমি ওগুলোকে তোমাদের অনুগত করে দিয়েছি; যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।' (সুরা আল-হাজ: আয়াত ৩৬–৩৭)
কার ওপর কুরবানি ওয়াজিব?
যারা জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে নিজেদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ ছাড়া অতিরিক্ত সাড়ে সাত তোলা সোনা, সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা অথবা এর সমমূল্যের সম্পদের মালিক হন, হানাফি মাজহাব অনুযায়ী তাদের ওপর কুরবানি ওয়াজিব। ইসলাম মৃত ব্যক্তিদের জন্য দোয়া, সদকা ও নেক আমলের মাধ্যমে উপকার পৌঁছানোর সুযোগ রেখেছে। সেই ধারাবাহিকতায় মৃত ব্যক্তির নামে কুরবানি করাও একটি সওয়াবের কাজ। তবে এর বিধান নির্ভর করে মৃত ব্যক্তি কোনো অসিয়ত করে গেছেন কি না তার ওপর। যদি অসিয়ত না থাকে, তাহলে সেই কুরবানির গোশত নিজেরা খাওয়া ও বিতরণ করা বৈধ। আর যদি অসিয়ত থাকে, তবে পুরো গোশত গরিবদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, কুরবানির মূল শিক্ষা হলো তাকওয়া, আন্তরিকতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ নিয়তে কুরবানির ইবাদত আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।



